যেখানে বেদপ্রচারের ধারায় আজ সবাই জানে যে বেদপাঠ,উপনয়নে অধিকার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার সেখানে আজও নিজেকে জোর করে ব্রাহ্মন পরিচয় দেয়া কিছু দস্যু তা অস্বীকার করতে চায়।পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ও নারীকে অবদমিত করে রাখার কুপ্রবৃত্তি ই এর মূল কারন,আর এর সঙ্গে অজ্ঞানতা তো আছেই!পৌরাণিক এই অভিশপ্ত মতবাদ আজও পুরোপুরি হিন্দু সমাজকে ছেড়ে যায়নি,এখনও তথাকথিত অনেক খ্যাতিমান ভগবৎ নাম প্রচারকারী গোষ্ঠীসমূহ প্রচার করে কলির জীবেরা নাকি সবাই শুদ্র,তাদের অভিশপ্ত ওই পুরাণগুলোই যে ঘোষণা করেছিল যে বেদে নারী ও শুদ্রদের অধিকার নেই!!!
এই জঘন্য ও মানবতা বিরোধী,নারীবিদ্বেষী প্রথার কারনে হিন্দু সমাজের যে ক্ষতি ইতিহাসে হয়েছে তা অপূরণীয়।কত সহস্র মহৎপ্রাণ হিন্দু ধর্মালম্বী যে এই অত্যাচারে,দুঃখে ধর্মান্তরিত হয়েছেন তার সাক্ষী মধ্যযুগের ইতিহাস।আজ এই বেদবিরোধী অপপ্রথার মূলরহস্য আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি।
আমরা সকলেই জানি যে সুবিখ্যাত মহর্ষি ব্যাসদেব ঐতিহাসিক গ্রন্থ মহাভারত রচনা করেন।পরবর্তীকালে রচিত পুরাণ নামক শাস্ত্রনামধারী বইসমূহও তিনি লিখেছেন বলে প্রচার করা হয়ে থাকে।এর মধ্যেই উল্লেখযোগ্য একটি হল ভাগবত পুরাণ বা ভাগবতাম।এর অত্যন্ত পরিচিত একটি শ্লোক হল-
স্ত্রী শুদ্র দ্বিজবন্ধুনাম
ত্রয়ী ন শ্রুতি গোচরা
কর্ম শ্রেয়সী মুধানাং শ্রেয় এবং ভবেদ ইহ
ইতি ভারতং আখ্যানাং
কৃপয়া মুণিনা কৃতং
(ভাগবত পুরাণ ১.৪.২৪)
অর্থাৎ স্ত্রী,শুদ্র ও দ্বিজবন্ধু(অর্থাৎ যে সমস্ত ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য বংশজাত ব্যাক্তি বিপথগামী) এই তিনশ্রেণী বেদপাঠ ও শ্রবণের অধিকারী নয়।তাই এদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে এদের শিক্ষার জন্য ব্যাসদেব মহাভারত রচনা করলেন!!!
এখন এই পুরাণের লেখক যদি ব্যাসদেব হন তাহলে মহাভারতেও তিনি একই কথা ই বলতেন কেননা এক ই ব্যাক্তি দুই রকম সাংঘর্ষিক কথা বলতে পারেন না!
কিন্তু দেখুন ব্যাসদেব মহাভারতে কি বলেছেন-
ভবন্তো বহুলাঃ সন্ত বেদো বিস্তার্য্যতাময়ম্।
শ্রাবয়েচ্চতুরো বর্ণান্ কৃত্বা ব্রাহ্মণমগ্রতঃ ।।
অর্থাৎ এই পবিত্র বেদ জ্ঞান গুরু-শিষ্য পরম্পরায় যুগ যুগ সঞ্চারিত হোক।ব্রাহ্মণরা সকল কিছুর অগ্রে বেদচর্চা করলেও চারবর্ণের লোকেরাও সকলে বেদচর্চা করুক!!!
তাহলে কিভাবে প্রথম শ্লোকটি ব্যাসদেব কর্তৃক লিখিত হয়?অন্ধবিশ্বাস ব্যাতীত এর ব্যখ্যা নেই!
আমরা এই বিষয়ে সকলেই অবগত যে পবিত্র বেদ ঈশ্বরের কর্তৃক প্রদত্ত মহান ঋষিগণের ধ্যানপ্রাপ্ত পবিত্র জ্ঞান।এই ঋষিদের মধ্যে কমপক্ষে ২৭ জন ছিল নারী ঋষিকাগণ।এদের মধ্যে রোমশ,লোপামুদ্রা,বাক্,অপালা,কাদ্রু,বিশ্ববারা,ঘোষা,জুহু,ভগম্ভ্রিনি,পৌলমি,যমী,ইন্দ্রাণী,সাবিত্রী,দেবযানী,নোধা,গৌপায়না,অম্ভৃনী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।এখন নারীদের যদি বেদপাঠে অধিকার ই না থাকে তাহলে তাঁরা বেদের মন্ত্রদ্রষ্টা হলেন কি করে!!!
অথর্ববেদ ঘোষণা করেছে,
“ব্রহ্মচর্যেন কন্যা যুবানং বিন্দতে পতিম্।”
(অথর্ববেদ ১১.৫.১৮)
অর্থাত্ ঠিক যেমন যুবক ব্রহ্মচর্য শেষ করে বিদুষী কন্যাকে বিয়ে করবে ঠিক তেমনি একজন যুবতীও ব্রহ্মচর্য শেষ করে পছন্দমত বিদ্বান যুবককে স্বামী হিসেবে গ্রহন করবে।
পাণিনি তার সংস্কৃত ব্যকরন শাস্ত্রে ছাত্রীদের ব্রহ্মচর্যের প্রতিষ্ঠান ছাত্রীশালা ও এর মহিলা অধ্যাপক আচার্যনি এর উল্লেখ করেছেন-
“মাতুলাচার্যাণামানুক্ত” -পাণিনি ৪.১.৪৬
এবং “ছাস্যাদযঃ ছাত্রীশালাযাম্” -পাণিনি ৬.২.৭৬
ব্রহ্মচারিনী ছাত্রীদের নারী শিক্ষক উপদেষ্টির উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্বেদ ১.৩.১১,১০.১৫৬.২ প্রভৃতিতে।
“চেতন্তি সুমতিনাম যজ্ঞম দধে সরস্বতী” -ঋগ্বেদ ১.৩.১১
এখানে নারী শিক্ষিকাকে জ্ঞানদাত্রী ও প্রেরনাদাত্রীরুপে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে।
ঋষি বিশ্ববারাকে দেখা যায় পবিত্র ঋগ্বেদে তিনি বেদমন্ত্র উচ্চারণ পূর্বক পূর্বমুখী হয়ে হোমযজ্ঞ করছেন।বেদের অনেক সুক্তে প্রিয় যজ্ঞবিশিষ্ট দম্পতিদের মন্ত্র উচ্চারণের কথা বলা হয়েছে।
স্বামী-স্ত্রীর একত্রে যজ্ঞ করা,মন্ত্রপাঠে স্তব উচ্চারণের ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে পবিত্র বেদে-
যা দম্পতি স মনসা সুনুত আ চ ধাবতঃ
(ঋগ্বেদ ৮.৩১.৫)
রিতিহোত্রা কৃতদ্বসু দশস্যান্তামৃতায় কম্
(৮.৩১.৯)
এরপরেও কি মেয়েদের শাস্ত্রপাঠের,বেদপাঠের অধিকার নিয়ে পৌরাণিক ধর্মধ্বজীদের বাগাড়ম্বর শোনার প্রয়োজন আছে কি?
মনে আছে রামায়ণে যখন শ্রীরাম তাঁর বনবাসের খবর নিয়ে কৌশল্যার গৃহে গেলেন তখন কৌশল্যা কি করছিলেন?
“ অগ্নিং জুহোতি স্ম তদা মন্ত্রবৎ কৃতমঙ্গলা”
অর্থাৎ মন্ত্রোচ্চারণ পূর্বক অগ্নিহোত্র করছিলেন।
প্রাচীন স্মৃতিশাস্ত্র যমসংহিতা বর্ণনা করেছে কিভাবে প্রাচীনকালে “মেয়েদের ও উপনয়ন হত,পৈতা পড়ত!”
শতপথ ব্রাহ্মণ বলছে,
“অধ্যাপনঞ্চ বেদানাং সাবিত্রীবচনং তথা…” অর্থাৎ শুধু পড়া ই নয় বরং ওই সময় নারী জ্ঞানীগণ বেদ অধ্যাপনার কাজ ও করতেন!নারী ব্রহ্মচারীগণ মূলত নারী শিক্ষিকাগণের নিকট ই গুরুকুলে পড়াশোনা পড়াশোনা করতেন।
উত্তররামচরিতমানস এর ২.৩ এ পাওয়া যায় ঋষিনী অত্রেয়ী বলছেন,
“এই অঞ্চলে অগস্ত্যসহ অনেক বিখ্যাত মহর্ষি আছেন।আমি মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রম থেকে এখানে এসেছি তাঁদের কাছ থেকে বেদ অধ্যয়ন করতে।”
এর চেয়ে সুস্পষ্ট প্রমান আর কি হতে পারে বৈদিক শাস্ত্রে নারীদের উপনয়ন তথা ব্রহ্মচর্য পালনের?
আর যখন ই ভণ্ড ধর্মব্যাবসায়ীরা পৌরাণিক যুগ এর সূচনা করল তখন ই এসব অপপ্রথা হিন্দু সমাজে প্রবেশ করল।এসব ভণ্ডদের চিনিয়ে দিতেই যুধিষ্ঠির মহাভারতের অনুশাসন পর্বের অষ্টাদশ অধ্যায়ে বলেছিলেন,
“ধূর্তৈঃ প্রবর্তিতং হ্যেতন্নৈতদ্ বেদেষু কল্পিতম…”
অর্থাৎ বেদে পশুবলি,বেদে শুদ্রদের অনধিকার,বর্ণপ্রথা এসব কিছুই নেই,এই সব ই ধূর্তদের সৃষ্টি।
এজন্যই যেসকল ধর্মীয় সংগঠন বা গুরু-প্রভু রুপধারী ভণ্ডরা যারা বলে বেদে,শাস্ত্রে নারীদের অধিকার নেই,শুদ্রদের অধিকার নেই,কলিতে সকলেই শুদ্র তাই কলির জীবের বেদে অধিকার নেই এদেরকে ভণ্ডামির দায়ে সমাজচ্যুত করা উচিৎ।
বেদের চিরন্তন সত্য পৌঁছে দিন সকলের মাঝে!
Saturday, April 22, 2017
বেদ সকলের সমান অধিকার
Hey visitor! I'm Satyajit Roy holding a big name of famous indian film director! but not for nothing at all ��. Trying to write something about something.
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment