Hare Krishna

Hare Krishna
Welcome to ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ

Tuesday, March 21, 2017

উপনিষদ ও স্বামী বিবেকানন্দ

যুগনায়ক বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তাচেতনায় উপনিষদের প্রভাব ছিল অপরিসীম। তিনি ছিলেন একাধারে কর্মযোগী, জ্ঞানযোগী ও ভক্তিযোগী। তিনি বেদান্তের অদ্বৈতবাদের ওপর নতুন আলোকপাত করেছিলেন এবং বেদান্তকে ব্যবহারিক জীবনে কি ভাবে প্রয়োগ করতে হয় তাও শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর মতে দ্বৈতবাদ, বিশিষ্টাদ্বৈতাবাদ ও অদ্বৈতবাদ ধর্মসাধনার ভিন্ন ভিন্ন স্তর, আর ছান্দোগ্য উপনিষদের আপ্তবাক্য ‘তত্ত্বমসি(তৎ ত্বম্ অসি)’(ছান্দোগ্য
-৬/৮/৭) অর্থাৎ ‘তুমিই তিনি’ বা বৃহদারণ্যক উপনিষদের মহাভাষ্য ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’(বৃহদারণ্যক-১/৪/১০) অর্থাৎ ‘আমিই ব্রহ্ম’ হচ্ছে উপলব্ধির শেষ কথা। অদ্বৈতবাদী বলেন “জীবো ব্রহ্মৈব নাপরঃ।” জীবে ও ব্রহ্মে কোনো ভেদ নেই। উপনিষদে অদ্বৈত ভাবের প্রতিপাদক অনেক বচন আছে; ব্রহ্ম যে নির্গুণ এবং সৃষ্টি যে মায়া-কল্পিত, এ-কথাও বলা হয়েছে। তাই স্বামিজী উপনিষদের নানা বচন উদ্ধৃত করে নিজের বক্তব্য প্রতিপাদন করেছেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ আত্মার অমরতার কথা বলে অর্জুনকে ক্লৈব্য পরিহার (‘ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ’ - শ্রীমদ্ভগবদ্গ
ীতা-২/৩) ও ভয়শূন্য (‘ন বিকম্পিতুম্’ - শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৩১) হবার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কঠোপনিষদের বীর্যবান ও শ্রদ্ধাবান নচিকেতার চরিত্রই স্বামিজীকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। পিতা ঋষি বাজশ্রবসের যজ্ঞকালে বালক নচিকেতার শ্রদ্ধার উদ্রেক হয়েছিল। স্বামিজী বলেছেন এই ‘শ্রদ্ধা’ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে ‘শ্রদ্ধা’ বলতে বোঝায় সংকল্পসাধনে অবিচলিত নিষ্ঠা যা মানুষকে সহস্র প্রলোভন জয় করতে শিক্ষা দেয়, যে নিষ্ঠার ফলে মানুষ ধর্মের পথ থেকে, সত্যের পথ থেকে ভ্রষ্ট হয় না।
কঠোপনিষদের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম বল্লীতে আত্মতত্ত্ব প্রসঙ্গে একটি আখ্যায়িকার অবতারণা করা হয়েছে। মৃত্যুরাজ যম নচিকেতাকে তিনটি বর দিতে চেয়েছিলেন। নচিকেতা প্রথম দুটি বরে পিতার যজ্ঞত্রুটি থেকে ক্ষমালাভ ও স্বর্গলাভের সাধনভূত অগ্নিবিদ্যা প্রার্থনা করে সহজেই তা’ লাভ করলেন। তৃতীয় বরে নচিকেতা পরলোকের রহস্য জানতে চাইলেন-
যেয়ং প্রেতে বিচিকিৎসা মনুষ্যে অস্তীত্যেকে নায়মস্তীতি চৈকে।
এতদ্ বিদ্যামনুশিষ্টস্ত্বয়াহ্হং বরাণামেষ বরস্তৃতীয়ঃ।। (কঠোপনিষদ-১/১/২০)
(কেউ বলেন মৃত্যুর পর আত্মা থাকে, কেউ বলেন আত্মা থাকে না। পরলোক সম্বন্ধে মানুষের মনে এই যে সন্দেহ বিদ্যমান সেই আত্মার তত্ত্ব আমি সম্যক জানতে ইচ্ছা করি)
মৃত্যুরাজ যম নচিকেতার এই মহাজ্ঞান লাভের যোগ্যতা পরীক্ষা করার জন্য তাঁকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তত্ত্ব-জিজ্ঞাসু বালক কোনো প্রলোভনেই বিচ্যুত হলেন না। তখন যম তাঁকে বলেছিলেন(কঠোপনিষদ-১/২/১)-
অন্যৎ শ্রেয়োহ্ন্যদুতৈব প্রেয়স্তে উভে নানার্থে পুরুষং সিনীতঃ।
তয়োঃ শ্রেয় আদদানস্য সাধু ভবতি হীয়তেহ্র্থাদ্ য উ প্রেয়ো বৃণীতে।।
(‘শ্রেয়’ অর্থাৎ কল্যাণকর বস্তু এবং ‘প্রেয়’ অর্থাৎ প্রীতিকর বস্তু এক নয়। শ্রেয়র প্রয়োজন মুক্তিলাভে, প্রেয়র প্রয়োজন ঐহিক সুখভোগে। যিনি শ্রেয়কে গ্রহণ করেন তাঁর কল্যাণ হয়, যিনি প্রেয়কে বরণ করেন তিনি পরমার্থ হতে বিচ্যুত হন।)
যমরাজ বললেন ‘তুমি বালক হয়েও যে প্রেয়র পথকে পরিহার করে শ্রেয়র পথ বেছে নিয়েছ সে জন্য তুমি প্রশংসার যোগ্য’। তারপর যম নানাভাবে আত্মতত্ত্ব ও আত্মজ্ঞান লাভের উপায় বিবৃত করে বললেন- উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।
ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দূরত্যয়া
দুর্গং পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি।। (কঠোপনিষদ-১/৩/১৮)
(উত্থিত হও, মোহনিদ্রা ত্যাগ করে জাগ্রত হও, শ্রেষ্ঠ আচার্যগণের সমীপে গমন করে আত্মতত্ত্ব জ্ঞাত হও; যাঁরা ক্রান্তদর্শী তাঁরা বলেন- আত্মজ্ঞানের পথ ক্ষুরধারের মতো দুর্গম, দূরতিক্রমণীয়।)
স্বামিজী-প্রবর্তিত মাসিকপত্র ‘উদ্বোধন’-এর মটো ছিল ‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্নিবোধত’। স্বামিজী তাঁর অনেক বক্তৃতায় এই বচনটি উদ্ধৃত করে ইংরেজিতে এর ভাবানুবাদ করেছেন ‘Awake, arise and stop not till the goal is reached’ – জাগো, উঠে দাঁড়াও এবং লক্ষ্যে না পৌঁছান পর্যন্ত থেমো না।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে ঋষি মানুষকে অমৃতের পুত্র বলে সম্বোধন করে বলেছেন ‘শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ’(শ্বেতাশ্বতর-২/৫)। বলেছেন মৃত্যুকে অতিক্রম করার পন্থা- ‘বেদাহ্মেতং পুরুষং মহান্তম্ আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ। তমেব বিদিত্বাহ্তি মৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেহ্য়নায়।।’ (শ্বেতাশ্বতর-৩/৮)। রবীন্দ্রনাথ এই দিব্যচেতনার শ্রুতিনন্দন অনুবাদ করেছেন ‘নৈবেদ্য’ কাব্যে-
‘শোনো বিশ্বজন,
শোনো অমৃতের পুত্র যত দেবগণ
দিব্যধামবাসী, আমি জেনেছি তাঁহারে,
মহান্ত পুরুষ যিনি আঁধারের পারে
জ্যোতির্ময়। তাঁরে জেনে, তাঁর পানে চাহি
মৃত্যুরে লঙ্ঘিতে পার, অন্য পথ নাহি’।
বৃহদারণ্যক উপনিষদে মৈত্রেয়ীর প্রতি যাজ্ঞবল্ক্যের উপদেশে অমৃতত্ব লাভের উপায় বর্ণিত হয়েছে। মৈত্রেয়ীর জিজ্ঞাসা ‘যেনাহং নামৃতা স্যাং কিমহং তেন কুর্যাং?’- যা দিয়ে অমরত্ব লাভ করতে পারব না, তা দিয়ে কি করব?(বৃহদারণ্যক
-২/৪/৩)। এই তো ভারতাত্মার চিরন্তন জিজ্ঞাসা, যার প্রতিধ্বনি বাইবেলে What profits us if we gain the world but lose our soul? উত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলেছিলেন ‘আত্মনস্তু কামায় সর্বং প্রিয়ং ভবতি’- সংসারে যা কিছু আমাদের প্রিয় তা আত্মার জন্যই(বৃহদারণ্যক-২/৪/৫)। জীবদেহ নশ্বর, জীবের আত্মা অবিনশ্বর। ঊনবিংশ শতকের ইংরেজ কবি লংফেলোর কবিতায় প্রতিফলিত একই চেতনা Dust thou art, to dust returnest was not spoken of the soul। এই আত্মাকে জানতে হবে। আত্মজ্ঞানী জরামৃত্যু-জনিত শোক উত্তীর্ণ হয়ে অমৃতত্ব লাভ করেন, আত্মাতেই যাঁর আনন্দ তিনিই স্বাধীন – সম্পূর্ণরূপে অপরতন্ত্র(ছান্দোগ্য-৭/২৫/২)। মুণ্ডক উপনিষদে আত্মাকে বলা হয়েছে ‘আনন্দরূপমমৃতম্’(মুণ্ডক-২/২/৮)- আনন্দময় আত্মা অমৃতস্বরূপ। মাণ্ডুক্য উপনিষদে(মাণ্ডুক্য/২) বলা হয়েছে এই আত্মাই ব্রহ্ম(‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’)। শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন বা নিশ্চিন্তরূপে ধ্যানের দ্বারাই আত্মাকে বা ব্রহ্মকে জানা যায়। এবং যিনি ব্রহ্মকে জানেন তিনি ব্রহ্মই হন- ‘যঃ ব্রহ্ম বেদ সঃ ব্রহ্মৈব ভবতি’(মুণ্ডক-৬৩)। অদ্বৈত বেদান্তরও সিদ্ধান্ত এই। স্বর্গ বা নরক ভোগ জীবের চরম গতি নয়। যা থেকে জীবের উদ্ভব সেই পরমব্রহ্মে লীন হওয়া জীবের পরম লক্ষ্য। বৃহদারণ্যক উপনিষদে যে জীবন্মুক্তিবাদ স্বীকৃত বৈদান্তিকগণও সেই জীবন্মুক্তির কথাই বলেছেন। স্বামিজীও এই ত্রিবিধ সাধনের দ্বারা আত্মোপলব্ধির কথা প্রচার করেছেন।
ঈশোপনিষদের প্রথম শ্লোকে রয়েছে-
‘ঈশা বাস্যমিদং সর্বং যৎ কিঞ্চ জগত্যাং জগৎ’
এই গতিশীল জগতের সব কিছুতে ঈশ্বর অভিব্যক্ত আছেন। বৃহদারণ্যক উপনিষদেও (২/৫/১৮) অদ্বৈতবাদের মূল সূত্রে রয়েছে-
‘নৈনেন কিঞ্চনানাবৃতং নৈনেন কিঞ্চনাসংবৃতম্’
এমন কিছু নেই যা ঈশ্বরের দ্বারা আবৃত নয়, এমন কিছু নেই যাতে ঈশ্বর অনুপ্রবিষ্ট নন। আত্মোপলব্ধির দ্বারাই ঈশ্বর উপলব্ধি হয়। মুণ্ডক উপনিষদে বলা হয়েছে ‘নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্য’(মুণ্ডক-৩/২/৪)- বলহীন ব্যক্তি এই আত্মাকে লাভ করতে পারে না। ‘বল’ শব্দে শুধু শারীরিক বা মানসিক বল নয়, আত্মনিষ্ঠা এবং আত্মজ্ঞান লাভের জন্য একাগ্রতার দ্বারা যে বীর্য লাভ হয় তাকেই ‘বল’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কেন উপনিষদেরও শ্রেষ্ঠ বাক্য ‘আত্মানাং বিন্দতে বীর্যং’(কেন-২/
৪) – আত্মার জ্ঞান থেকে বীর্য লাভ হয়। এই বল যাদের নেই, যাদের দুর্বল চিত্ত বিষয়-কামনা, সংসারের প্রলোভন দ্বারা বিক্ষিপ্ত তারা আত্মাকে লাভ করতে পারে না। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন উপনিষদ আমাদের ‘অভীঃ’ বা অভয় মন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছে। ‘অভীঃ’ মন্ত্রই স্বামিজী দিগ্দিগন্তে প্রচার করেছেন। তাঁর মতে ধর্ম-সাধনার প্রধান লক্ষণই হচ্ছে ভয়শূন্য হওয়া।
স্বামী বিবেকানন্দ উপনিষদের বাণীর উপর নূতন আলোকপাত করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন- উপনিষদ বা বেদান্ত আমাদের শুধু প্রজ্ঞাবান করে না, বীর্যবান ও শক্তিমান করে তোলে। আর যিনি বৈদান্তিক, তিনিই যথার্থ কর্মযোগী হতে পারেন। আধুনিক কালে তিনি নূতন আলোকে বেদান্তচর্চার সূত্রপাত করেছেন। নূতন যুগের দিব্যদূত হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ।
পরিশেষে ১৩২৯ সনের ১৪ই কার্তিক তারিখের ‘ধুমকেতু’ পত্রিকা থেকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদকীয় প্রবন্ধ ‘আমি সৈনিক’-এর অংশবিশেষ উদ্ধৃত করছি-
“এখন দেশে সেই সেবকের দরকার যে সেবক দেশ-সৈনিক হ’তে পারবে। রবীন্দ্রনাথ, অরবিন্দ, প্রফুল্ল বাঙলার দেবতা, তাঁদের পূজার জন্য বাঙলার চোখের জল চিরনিবেদিত থাকবে। কিন্তু সেনাপতি কই? কোথায় আঘাতের দেবতা, প্রলয়ের মহারুদ্র? সে পুরুষ এসেছিলেন- বিবেকানন্দ, সে সেনাপতির পৌরুষ-হুঙ্কার গর্জে উঠেছিল বিবেকানন্দের কন্ঠে।”

পবিত্র বেদবাক্য

প্রকৃতি ও মানুষ

বিশ্বজগতের যেটুকু অংশে ভৌতিক স্তরে অভিব্যক্ত, শুধু সেইটুকুই প্রকৃতি-সম্বন্ধে আধুনিক ধারণার অন্তর্গত। মন বলতে সাধারণতঃ যাহা বুঝায়, তাহা প্রকৃতিরূপে বিবেচিত হয় না।ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা প্রতিপন্ন করতে গিয়ে দার্শনিকগণ মনকে প্রকৃতি হতে বাদ দিয়া থাকবেন, কারণ প্রকৃতি নিয়মের—কঠোর অনমনীয় নিয়মের শাসনে আবদ্ধ, প্রকৃতির অন্তর্গত বিবেচিত হলে মনও নিয়মের অধীন হয়ে পড়বে। ফলে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির মতবাদ দাঁড়াতে পারবে না; কেন না যাহা কোন নিয়মের অধীন, তাহা কিরূপে স্বাধীন বা স্বতন্ত্র হতে পারে?যুক্তি ও তথ্যের উপর দণ্ডায়মান ভারতীয় দার্শনিকগণের দৃষ্টিভঙ্গী এ-বিষয়ে বিপরীত। তাঁদের মতে—ব্যক্ত অথবা অব্যক্ত সমগ্র বাস্তব জীবনই নিয়মের অধীন। তাঁদের মতে: মনও বাহ্য প্রকৃতি, দুই-ই নিয়মের—একই নিয়মের অধীন। মন যদি নিয়মের অধীন না হয়, আমরা এখন যা চিন্তা করতেছি, তাহা যদি পূর্ব চিন্তার অনিবার্য ফলস্বরূপ না হয়, যদি একটি মানসিক অবস্থা আর একটি মানসিক অবস্থার অনুসরণ না করে, তবে মনকে অযৌক্তিক বলতে হবে। এমন কে আছে, যে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি স্বীকার করে যুক্তির ক্রিয়া অস্বীকার করতে পারে? অপর পক্ষে মন কার্য-কারণ নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, ইহা স্বীকার করেই কে বলতে পারে যে, ইচ্ছাশক্তি স্বাধীন?নিয়মই কার্য-কারণের ক্রিয়া। পূর্ববর্তী কতকগুলি ঘটনার অনুযায়ী হয়ে পরবর্তী কতকগুলি ব্যাপার ঘটে থাকে। প্রতিটি পূর্বগামী ঘটনার বা কারণের অনুবর্তী কার্য আছে। প্রকৃতি এরূপেই চলেছে। এই নিয়মের শাসন যদি মনের স্তরেও চালু থাকে, তাহলে মন বদ্ধ—স্বাধীন নয়। না, ইচ্ছাশক্তিও স্বাধীন নয়। ইহা কিভাবে সম্ভব? কিন্তু আমরা সকলেই জানি, অনুভব করি যে, আমরা স্বাধীন। স্বাধীন না হলে আমাদের জীবনের কোন অর্থ থাকে না, জীবনযাপন বৃথা হইয়ে যায়।প্রাচ্যদেশীয় দার্শনিকগণ এই মতবাদ গ্রহণ করেছেন, বা বলা যায়—উদ্ভাবন করেছেন যে, মন এবং ইচ্ছাশক্তি দেশকালনিমিত্তের দ্বারা তথা- কথিত জড়বস্তুর মতোই বদ্ধ; সুতরাং উহারা কার্যকারণের নিয়মে শাসিত। আমরা কালের মধ্যে চিন্তা করি, আমাদের চিন্তাগুলি কালের দ্বারা সীমিত; যা কিছুর অস্তিত্ব আছে, সে সব কিছুই দেশে ও কালে বর্তমান। সব কিছুই কার্য-কারণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ।যাকে আমরা জড়পদার্থ বলি, এবং মন—এ দুইই একই উপাদানে গঠিত। প্রভেদ কেবল কম্পনের তারতম্যে। মনের অতি নিম্নগ্রামের স্পন্দনকেই আমরা জড়বস্তু বলে জানি। আবার জড়পদার্থের দ্রুত স্পন্দনকে আমরা মন বলে জানি। উভয়ের উপাদান একই। অতএব জড়পদার্থ এবং দেশকালনিমিত্ত্বের দ্বারা সীমিত বলে জড়ের দ্রুত স্পন্দন মনও একই নিয়মের দ্বারা আবদ্ধ।প্রকৃতির উপাদান সর্বত্র সমজাতীয়। প্রভেদ কেবল বিকাশের তারতম্যে। এই বিশ্বপ্রপঞ্চের সংস্কৃত প্রতিশব্দ হইল 'প্রকৃতি' এবং এর আক্ষরিক অর্থ 'প্রভেদ'। সবই এক উপাদান, কিন্তু ইহা বিচিত্ররূপে অভিব্যক্ত।মন জড়ে রূপান্তরিত হয়, আবার জড়ও মনে রূপান্তরিত হয়, ইহা শুধু কম্পনের তারতম্য।একটি ইস্পাতের দণ্ড লও, উহাকে কম্পিত করতে পারে—এইরূপ একটি শক্তি এতে প্রয়োগ কর; তারপর কি ঘটবে? যদি একটি অন্ধকার ঘরে এই পরীক্ষাটি করা হয়, তবে প্রথমে তুমি শুনিতে পাবে একটি শব্দ—একটি গুনগুন শব্দ। শক্তিপ্রবাহ বর্ধিত কর, দেখিবে ইস্পাতের দণ্ডটি আলোকময় হয়ে উঠেছে। শক্তি আরও বর্ধিত কর, ইস্পাতের দণ্ডটি আলোকময় হয়ে উঠিয়াছে। শক্তি আরও বর্ধিত কর, ইস্পাত-দণ্ডটি একেবারে অদৃশ্য হয়ে যাবে। উহা মনে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।আর একটি উদাহরণ লও: দশদিন আহার না করলে আমি কোনপ্রকার চিন্তা করতে পারি না। শুধু কয়েকটি এলোমেলো চিন্তা আমার মনে থাকবে। আমি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ব এবং সম্ভবতঃ আমার নামও ভুলে যাব। তারপর কিছু খাদ্য গ্রহণ করলাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যে চিন্তা করতে আরম্ভ করব; আমার মনের শক্তি ফিরে আসছে। খাদ্যই মনে রূপান্তরিত হয়েছে। তেমনি স্পন্দনের গতিবেগ কমিয়ে মন দেহে অভিব্যক্ত হয়, জড়ে পরিণত হয়।জড় ও মন—এ দুইটির কোনটি প্রথম? একটি উদাহরণসহ বুঝাইতেছি—একটি মুরগী ডিম পাড়ল, ডিমটি হতে আর একটি মুরগীর জন্ম হল;মুরগীটি আর একটি ডিম পাড়ল; ডিমটি হতে আবার আর একটি মুরগী জন্মিল; অনন্ত কার্যকারণ-পরম্পরা এইরূপ চলতে থাকবে। এখন কোন্টি প্রথম—ডিম, না মুরগী? এমন কোন ডিমের কথা কল্পনা করতে পার না, যাহা কোন মুরগী হতে জন্মে নাই; অথবা এমন কোন মুরগীর বিষয় চিন্তা করতে পার না, যাহা ডিম হতে ফুটে নাই। যেটিই প্রথম হোক না কেন, তাতে কিছু আসে যায় না। আমাদের প্রায় সব চিন্তাধারাই এই ডিম ও মুরগীর ব্যাপারের মতো১।১ তুলনীয় : বীজাঙ্কুর-ন্যায়মহত্তম সত্যগুলি অত্যন্ত সরল বলেই বিস্মৃতির গর্ভে চলে যায়। মহৎ সত্যগুলি সহজ, কেন না এগুলির প্রয়োগ সার্বকালিক। সত্য নিজেই সর্বদা সহজ ও সরল। যা কিছু জটিল, তা কেবল মানুষের অজ্ঞতার জন্য।মানুষের স্বতন্ত্র কর্তৃত্ব মনেতে নাই, কেন না মন বদ্ধ। সেখানে কোন স্বাধীনতা নাই। মানুষ মন নয়, আত্মা। এই আত্মা সর্বদা মুক্ত, সীমাহীন ও চিরন্তন। এইখানেই—এই আত্মাতেই মানুষের মুক্তভাব। আত্মা সর্বদাই মুক্ত; কিন্তু মন উহার ক্ষণস্থায়ী তরঙ্গগুলির সঙ্গে নিজেকে এক মনে করে আত্মাকে দেখতে পায় না এবং দেশকালনিমিত্ত-রূপ গোলকধাঁধায়—মায়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেলে।ইহাই আমাদের বন্ধনের কারণ। আমরা সর্বদা মন এবং মনের অদ্ভুত পরিবর্তনগুলির সঙ্গে নিজেদের এক ভাবছি।মানুষের স্বতন্ত্রভাব আত্মাতেই অবস্থিত এবং নিজেকে মুক্ত উপলব্ধি করেই—মনের বন্ধন সত্ত্বেও সর্বদা ঘোষণা করছে: আমি মুক্ত! আমি যা, আমি তাই; আমি সেই। ইহাই আমাদের মুক্তি। সদামুক্ত সীমাহীন চিরন্তন আত্মা যুগে যুগে তাঁহার মন-রূপ যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ক্রমে ক্রমে অধিকতর ব্যক্ত হয়েছেন।তাহা হলে মানুষের সহিত প্রকৃতির সম্পর্ক কি? জীবের নিম্নতম বিকাশ হতে মানব পর্যন্ত—সর্বত্রই প্রকৃতির মধ্য দিয়া আত্মা বিকশিত হতেছেন। নিম্নতম অভিব্যক্ত জীবনের মধ্যেও আত্মার শ্রেষ্ঠ বিকাশ নিহিত আছে, ক্রমবিকাশের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্মা নিজের বিকাশ সাধন করছেন। বিবর্তনের সমগ্র প্রক্রিয়াই আত্মার নিজেকে ব্যক্ত করবার সংগ্রাম। ইহা প্রকৃতির বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম। প্রকৃতির অনুযায়ী কাজ করে নয়, তাহার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই মানুষ আজ বর্তমান অবস্থা লাভ করেছে। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনধারণ করা, প্রকৃতির সঙ্গে একতানতা রক্ষা করা প্রভৃতি সম্বন্ধে বহু কথাই আমরা শুনে থাকি। এরূপ ধারণা ভ্রম। এই টেবিলটি, এই জলের কুঁজাটি, এই খনিজ পদার্থগুলি, ঐ বৃক্ষ—এরা সকলেই প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখিয়া চলছে। সেখানে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য বিদ্যমান—কোন বিরোধ নাই। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের অর্থ নিশ্চেষ্টতা, মৃত্যু। মানুষ এই গৃহ কিরূপে নির্মাণ করেছে—প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে? না, প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ইহা নির্মিত হয়েছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামের পথেই মানুষের উন্নতি, প্রকৃতির অনুগত হয়ে নয়।
সুত্র- স্বামী বিবেকানন্দের বাণী এবং রচনা।

Monday, March 20, 2017

শ্রীমদ্ভগবদগীতা ষষ্ঠ অধ্যায়ের শ্লোক ২৯-৩০-৩১ এর সারাংশ

জীবে প্রেম, স্বার্থত্যাগ, ভক্তি ভগবানে-এই তিনটি এক। আত্মজ্ঞান ব্যতীত স্বার্থত্যাগ নাই, কেননা, 'আমিত্ব' 'মমত্ব'-বোধ থাকলে প্রকৃত স্বার্থত্যাগ হয় না, স্বার্থত্যাগ ব্যতীত জীবে প্রেম নাই, জীবে প্রীতি ভিন্ন ঈশ্বরে ভক্তি নাই। যিনি একত্বে স্থিত হয়ে, সর্বভূতে একমাত্র আমি আছি এরূপ বুদ্ধি অবলম্বন করেন এবং সকলের মধ্যে আমি আছি সেই আমাকে ভজন করেন সর্বভুতেই নারায়ণ আছেন এই জানিয়া নারায়ণ জ্ঞানে সর্বভূতে প্রীতি করেন, সেবা করেন, তিনি যে অবস্থায়ই থাকেন না কেন, তিনি আমাতেই থাকেন অর্থাৎ তাঁহার চিত্ত আমাতেই নিযুক্ত থাকে, তাহার ইচ্ছা আমারই ইচ্ছায়, তাঁহার কর্ম আমারই কর্মে পরিণত হয়।
"তিনি জ্ঞানে মদ্ভাবপ্রাপ্ত, কর্মে মৎকর্মকৃৎ, ভক্তিতে মদ্গতচিত্ত"

পবিত্র বেদবাক্য

বেদে দ্বিভূজ বিষ্ণু(কৃষ্ণ) রুপই নিত্যসিদ্দ

সূচনাঃ আদি নিত্য বিষ্ণুই কৃষ্ণ,তিনি দ্বিভূজ হতে চতুর্ভুজরুপ কারন,গর্ভোদক,ক্ষীরোদক বিষ্ণু আদিতে স্বরুপ হন। তাই বেদ,উপনিষদ,গীতা,ভাগবত আদিতে দ্বিভূজ বিষ্ণু কৃষ্ণেরই মহিমা বর্ণনা করে। যথা-
শুক্ল যজুর্বেদ ৫।১৯
দিবো বা বিষ্ণো উত বা পৃথিব্যা মহো বা বিষ্ণু উরোরন্তরিক্ষাৎ।
উভো হি হস্তা বসুনা পৃনস্বা প্রযচ্ছ দক্ষিণাদোত সব্যাদ্বিষ্ণবে ত্বা।।
অন্বয়ঃ
হে (বিষ্ণু)-বিশ্বজগতের মহাপ্রভু (দিব)-দ্যুলোক হইতে (উত বা মহো)-অনেক মহৎ (পৃথিব্যা)-ভুলোক হইতে হে (বিষ্ণু)-বিশ্বজগতের মহাপ্রভু (উরো)- অনন্ত প্রসারী (অন্তঃরিক্ষাত্)- অন্তরিক্ষ হইতে (উভা হস্ত+আ)-উভয় অপ্রাকৃত হস্তকে (বসু+ না)-পরমধন দ্বারা (আ +পৃণস্ব)-আপনি পূর্ণ করুন আর (দক্ষিণাত)-ডানে (উত)এবং (সব্যদ)-বামে (আ +প্রযচ্ছ)-আপনি প্রদান করুন (বিষ্ণবে)-প্রাপ্তি নিমিত্তে উপাসনা করি (ত্বা)-আপনাকে।।
অনুবাদঃ হে বিশ্বজগতের মহাপ্রভু আপনি দ্যুলোক হইতে কি ভূলোক হইতে কিংবা অনন্ত প্রসারী অন্তরিক্ষলোক হইতে পরমধন লইয়া আপনি উভয় হস্তকে পূর্ণ করুন আর দক্ষিণ ও বাম হস্ত (উভয় হস্ত) দ্বারা অবাধে অবিচারে আপনি সেই পরমধন প্রদান করুন,আপনাকে প্রাপ্তি নিমিত্ত উপাসনা করি।।
প্রসঙ্গঃ
i.এখানের ভগবানের স্বরুপ বর্ণিত
ii.এখানে ভগবানের মহিমা কথা বর্ণিত
iii.এখানে ভগবানই ভক্তি প্রদান করেন তা বর্ণিত।
iv.এখানে ভক্তের শরণাগতির কথা বর্ণিত।

Sunday, March 19, 2017

শ্রীমদ্ভগবদগীতা অঃ১২/শঃ১৭

আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ

বৌদ্ধধর্মের মূল সত্য_ মানবজীবন দুঃখময়, সেই দুঃখের প্রকৃত কারণ তৃষ্ণা। পৃথিবী দুঃখে পূর্ণ। জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, শোক, রোদন, মনের খিন্নতা ও অশান্তিই হলো দুঃখ। অপ্রিয় ব্যক্তির সংযোগ দুঃখ, প্রিয়বিয়োগ দুঃখ, চাহিদা অনুযায়ী বস্তু না পাওয়া দুঃখ, যা অনভিপ্রেত তেমন বস্তু লাভ দুঃখ। আমার চাই_ এটিই তৃষ্ণা। এই তৃষ্ণা সব অশান্তির কারণ। এই তৃষ্ণা বিনাশ করতে পারলে শান্তি পাওয়া সম্ভব। এ জন্য দুঃখের মূল কারণ নিরোধ করতে হবে। তার উপায় কী? উপায়_ আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ (অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ আটটি পথ): ১. সম্যক দৃষ্টি, ২. সম্যক সঙ্কল্প, ৩. সম্যক বাক্য, ৪. সম্যক কর্ম, ৫. সম্যক জীবিকা, ৬. সম্যক প্রযত্ন, ৭. সম্যক স্মৃতি, ৮. সম্যক সমাধি।
সম্যক দৃষ্টি_ ভালোমন্দ কাজের সঠিক জ্ঞানকে বলে সম্যক দৃষ্টি। দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখনিরোধ ও দুঃখনিরোধগামী মার্গ (বা পথের) জ্ঞান হলো সম্যক দৃষ্টি।
সম্যক সঙ্কল্প_ রাগ, হিংসা, প্রতিহিংসাবিহীন সঙ্কল্পকেই সম্যক সঙ্কল্প বলে।
সম্যক বাক্য_ মিথ্যা, চুকলি, কটু ভাষণ ও বৃথা বাক্য থেকে বিরত হয়ে সত্য, প্রিয় ও অর্থপূর্ণ বাক্য বলা।
সম্যক কর্ম_ হিংসা, চুরি, ব্যভিচার ছাড়া ভালো কাজ।
সম্যক জীবিকা_ মিথ্যা জীবিকা ত্যাগ করে সৎ জীবিকা দ্বারা জীবনযাপন করা।
সব রকম প্রাণিহিংসা, প্রাণিহত্যা প্রভৃতির মাধ্যমে গৃহীত জীবিকাকে মিথ্যা জীবিকা বলে। অস্ত্র, প্রাণী, মাংস, নেশা ও বিষ প্রভৃতি নিয়ে বাণিজ্যকে মিথ্যা জীবিকা বলে।
সম্যক প্রযত্ন_ কুচিন্তা ত্যাগ করে সুচিন্তা উৎপাদন, সুচিন্তার যত্ন ও বৃদ্ধির চেষ্টাই সম্যক প্রযত্ন বা প্রচেষ্টা।
সম্যক স্মৃতি_ ভালো কাজের প্রকৃত স্থিতি এবং মলিনতা দূর করা সম্ভব, এ কথা স্মরণ ও ভাবনাকে বলে সম্যক স্মৃতি।
সম্যক সমাধি_ চিত্তের একাগ্রতাকে বলে সমাধি। এর দ্বারা মনের চঞ্চলতা দূর করা সম্ভব। 'সব রকম পাপকাজ থেকে বিরত থাকা, আপন চিত্তকে সংযত ও পরিশুদ্ধ রাখাই বুদ্ধগণের উপদেশ'_ এই শিক্ষা মনে রাখা।
এই আটটি মার্গ বা পথ অনুশীলন করাই হলো 'আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ'। এই পথ অনুসরণ করা কঠিন; কিন্তু এতে কোনো রকম দুর্জ্ঞেয়তা বা অস্পষ্টতা নেই। এ পথ অনুসরণ করলে চরম শান্তি পাওয়া অবশ্যই সম্ভব।