Hare Krishna

Hare Krishna
Welcome to ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ

Sunday, March 12, 2017

পবিত্র বেদবাক্য

শ্রীচৈতন্য ভাগবতঃ অঃ ১৪/১৪২

চৈতন্য মহাপ্রভুর ব্যবহৃত সামগ্রী

দোল পূর্ণিমা, হোলি উৎসব এবং শ্রী গৌর পূর্ণিমা কি ??

প্রথমে বলি দোল পূর্ণিমার কথা। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে বৃন্দাবন লীলায় ব্রজবাসীগণ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তি রাধা রানীকে একত্রে পেয়ে সীমাহীন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তাঁদের চরণে আবির ঢেলে রঞ্জিত করে দেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধা রানীও এ আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেন।
কিন্তু, ঐ দিনটি ছিল ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথি। ঐ দিনটিতে এতোটাই আনন্দ উৎসব যে পরবর্তীতে বৃন্দাবন বাসীরা আর ঐ দিনটিকে ভুলতে পারেন নি। যা আজও মানুষ পালন করে চলেছে। এই দিন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আর রাধা রানীকে বৃন্দাবন বাসীরা প্রেমানন্দে দোলনায় দোল দিয়েছিল বলে এই উৎসবটিকে দোল উৎসবও বলা হয়। আর ফাল্গুন মাসের এই পূর্ণিমাকে বলা হয় দোল পূর্ণিমা।
এই উৎসবটি পরবর্তীতে সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। এই উৎসবটি পরে হোলি নামে খ্যাতি পায়। ধরে নেওয়া হয় অত্যাচারী রাজার হিরণ্যকশিপুর দানবী বোন হোলিকা থেকে এই নামের উৎপত্তি। সকল প্রকার দানবীর ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে জয়লাভের প্রতীক-ই হলো এই রঙিন আনন্দ উৎসব। এখন সমগ্র বিশ্বের মানুষ আজ এই উৎসব পালন করছে, কেউ বলছে ফেস্টিভাল অফ কালারস।
এবার আসি গৌর পুর্নিমার কথায়। শ্রী গৌর সুন্দর হলেন কলি যুগের সাক্ষাৎ কৃষ্ণ অবতার।। কলির অধঃপতিত জীবদের করুনা করতে তিনি আবির্ভূত হলেন শ্রীধাম নবদ্বীপে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে তিনি বেছে নিলেন ইংরেজি 1486 সালের ফাল্গুন মাসের এই পূর্ণিমা তিথি তথা দোল পূর্ণিমার এই পুন্য তিথিকে। যেন আনন্দ উৎসবে এক নতুন মাত্রা যোগ করলেন। আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয়টি হচ্ছে ঐদিন সন্ধ্যায় মহাপ্রভুর আবির্ভাবের সময় হঠাৎ করে চন্দ্র গ্রহণ শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ পূর্ণিমার মাঝে চন্দ্র গ্রহণ। যাকে বলা হয় eclipse of full moon যা জোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল একটি সন্ধিক্ষণ। শত বছরে এক দুইবার খুবই অল্প সময়ের জন্য এই সন্ধিক্ষণগুলো আসে। তাই মহাপ্রভুর জন্মের এই সময়কে বলা হয় Auspicious সময়। এই রহস্যময় সময়েই দিক বিদিক আলো করে উলুধ্বনি আর শঙ্খনাদের গর্জনে শচীমাতা আর জগন্নাথ মিশ্রের ঘরে আবির্ভূত হলেন শ্রীম্মন মহাপ্রভু। মহাপ্রভুর জয় হোক।
তাই এই পবিত্র তিথি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। এই দিনই সকল কৃষ্ণ ভক্ত মানুষের নয়নের মনি শচীনন্দন শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথি।
সে কারনেই আজকের এই পুন্য তিথিটি সকল বৈষ্ণব তথা সকল কৃষ্ণ ভক্ত মানুষদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। আসুন, সবাই আবির ছুঁয়ে দেখি, রাধা গোবিন্দের শ্রী চরণের আবিরে নিজেদের রঞ্জিত করি আর সেই সাথে গৌর বন্দনা করে হই পুলকিত।।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।

কলির কুলষতায় পড়ে কু-ধর্মের অপপ্রচার

আজকাল কিছু অপপ্রচারকারী শাস্ত্র গ্রন্থের ভুল ব্যাখ্যা করে বলছে যে কলিকালে সকল মানুষকে ধর্ম অনুশীলন করতে বলা হয়েছে এবং তাঁহারা আমাদের ধর্মগ্রন্থের ভূল ব্যাখ্যা করে মানুষকে ভুল বুঝিয়ে ছলের আশ্রয় নিয়েছে- আসুন জানি আমাদের প্রামাণিক শাস্ত্র সমূহ কি বলছে-
এই সম্পর্কে বৃহন্নারদীয় পুরাণে বলা হয়েছে
হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্।
কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা ।।
“কলিযুগে একমাত্র ধর্ম হচ্ছে হরিনাম কীর্তন করা, হরিনাম কীর্তন করা, হরিনাম কীর্তন করা। এ ছাড়া অন্য কোনও পন্থা নেই, অন্য কোন পন্থা নেই, অন্য কোনও পন্থা নেই।” ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, মন্মনা ভব ‘আমাকে স্মরণ কর’, মামেকং শরণং ব্রজ ‘একমাত্র আমার শরণাগত হও।’ তেমনই ভক্তরূপে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন-
বল কৃষ্ণ, ভজ কৃষ্ণ, শুন কৃষ্ণনাম।
অহর্নিশ শ্রীকৃষ্ণচরণ কর’ ধ্যান ।।
(চৈঃ ভাঃ মধ্য ১/৩৩৬)
শ্রীমদ্ভাগবতে (১১/৫/৩২) সেই সম্বন্ধে বলা হয়েছে
কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গস্ত্রপার্ষদম্।
যজ্ঞৈঃ সংকীর্তনপ্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ ।।
“যে পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ পদাংশ ধ্বনি নিরন্তর উচ্চারণ করেন, কলিযুগের বুদ্ধিমান মানুষেরা তাঁর উপাসনার নিমিত্ত সমবেতভাবে নাম-সংকীর্তন করে থাকেন। যদিও তাঁর গাত্রবর্ণ কৃষ্ণ নয়, তবুও তিনিই কৃষ্ণ। তিনি সর্বদা তাঁর পার্ষদ, সেবক, সংকীর্তনরূপ অস্ত্র ও ঘনিষ্ঠ সহচর পরিবৃত থাকেন।” শ্রীকৃষ্ণ যে এই কলিযুগে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে অবতীর্ণ হয়ে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করে কৃষ্ণ-সংকীর্তন প্রচার করবেন, তার উল্লেখ মহাভারতে দেখতে পাওয়া যায়-
সুবর্ণবর্ণো হেমাঙ্গো বরাঙ্গশ্চন্দনাঙ্গদী।
সন্ন্যাসকৃচ্ছমঃ শান্তো নিষ্ঠাশান্তিপরায়ণঃ
তাঁর আদিলীলায় তিনি স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল বর্ণের সুন্দর দেহ ধারণ করে গৃহস্থরূপে লীলাবিলাস করেন। তাঁর সর্বাঙ্গ সুন্দর এবং তাঁর চন্দন-চর্চিত শ্রীঅঙ্গ কাঞ্চনের মতো দ্যূতিসম্পন্ন। তাঁর পরবর্তী লীলায় তিনি সন্ন্যাস-আশ্রম গ্রহণ করেন। তখন তিনি শমগুণ সম্পন্ন ও শান্ত। তিনি শান্তি ও ভক্তির পরম আশ্রয়, কেন না তিনি নির্বিশেষবাদী অভক্তদের নিবৃত্ত করেন।”
সুতরাং উপরোক্ত উপদেশগুলির মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই; সর্বত্রই নাম-সংকীর্তনের মাধ্যমে লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করতে বলা হয়েছে। সেই সম্বন্ধে শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (আদি ৩/৪০) উল্লেখ করেছেন-
কলিযুগে যুগধর্ম-নামের প্রচার।
তথি লাগি’ পীতবর্ণ চৈতন্যাবতার ।।
“কলিযুগের যুগধর্ম হচ্ছে ভগবানের মহিমা প্রচার। সেই উদ্দেশ্য সাধন করবার জন্য ভগবান পীতবর্ণ ধারণ করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে আবির্ভূত হয়েছেন।” তা ছাড়া শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (৩/১৯-২০) আরও বলা হয়েছে
যুগধর্ম প্রবর্তাইমু নাম-সংকীর্তন।
চারি ভাব-ভক্তি দিয়া নাচামু ভুবন ।।
আপনি করিমু ভক্তভাব অঙ্গীকারে।
আপনি আচরি’ ভক্তি শিখাইমু সবারে ।।
“আমি স্বয়ং এই কলিযুগের নাম-সংকীর্তন বা সম্মিলিতভাবে ভগবানের মহিমা কীর্তন প্রবর্তন করব। ভগবৎ-ভক্তির চার প্রকার রস আস্বাদন করিয়ে আমি সমগ্র জগৎকে প্রেমানন্দে উদ্বেলিত করে নৃত্য করাব। ভক্তের ভূমিকা অবলম্বন করে আমি সকলকে ভক্তিযোগে ভগবানকে সেবা করার শিক্ষা দান করব।”
সাধারণ যুগধর্ম ভগবানের অংশ-কলা-যুগাবতার দ্বারাই সাধিত হয়ে থাকে। যেমন সত্যযুগের যুগাবতার শুক্লবর্ণ রূপ নিয়ে অবতীর্ণ হয়ে সত্যযুগের জন্য নির্ধারিত ধ্যানের পন্থা শিক্ষাদান করেন। ত্রেতাযুগের যুগাবতার রক্তবর্ণ রূপ নিয়ে অবতীর্ণ হয়ে ত্রেতাযুগের নির্ধারিত পন্থা যজ্ঞা আদি শিক্ষা প্রদান করেন। দ্বাপর যুগের যুগাবতার কৃষ্ণবর্ণ রূপ নিয়ে অবতীর্ণ হয়ে অর্চন শিক্ষাপদ্ধতি দান করেন। ঠিক তেমনই কলিযুগের যুগাবতার পীতবর্ণ রূপ নিয়ে অবতীর্ণ হয়ে যুগধর্ম নাম-সংকীর্তন প্রবর্তন করেন। কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হচ্ছেন লীলাবতার, শক্ত্যাবেশ অবতার, গুণাবতার, যুগাবতার, মন্বনÍর অবতার ও পুরুষাবতার আদি অনন্ত অবতারের অবতারি বা উৎস। তিনি হচ্ছেন স্বয়ং লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। সুতরাং শুধুমাত্র যুগধর্ম প্রবর্তনই তাঁর অবতরণের একমাত্র কারণ নয়। তাঁর অবতরণের মুখ্য কারণ সম্বন্ধে শ্রীচৈতন্য-চরিত
ামৃতে (আদি ১/৬) প্রতিপন্ন হয়েছে, “শ্রীরাধার প্রেমের মহিমা কি রকম, ওই প্রেমের দ্বারা শ্রীরাধা শ্রীকৃষ্ণের যে অদ্ভুত মাধুর্য আস্বাদন করেন, সেই মাধুর্যই বা কি রকম এবং শ্রীকৃষ্ণের মাধুর্য আস্বাদন করে শ্রীরাধা যে সুখ অনুভব করেন, সেই সুখই বা কি রকমএই সমস্ত বিষয়ে জানবার জন্য লোভ জন্মানোর ফলে শ্রীরাধার ভাবযুক্ত হয়ে শ্রীকৃষ্ণরূপ চন্দ্র শচীগর্ভ-সিন্ধুতে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
তাই ভক্তবৃন্দ আমাদের অন্যের কথায় প্ররোচিত না হয়ে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য
মহাপ্রভুর নির্দেশ পালন করাই কর্তব্য । আমাদের জন্যই শাস্ত্রে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । তাই আসুন, ভক্তির সহজ পথ এই নাম সংকীর্তন করে ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম লাভ করার জন্য আমরা সকলেই সচেষ্ট হই। ইহাই হোক আমাদের সকলের একান্ত প্রত্যাশা।
পরমপুরুষ ভগবান আমাদের সকলের মঙ্গল করুন।

বানি চিরন্তন

পবিত্র বেদবাক্য

হোলি বা দোল উৎসব এর ইতিহাস

হিন্দুধর্ম ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও উৎসবের আনন্দে মানবতার বাণীকেই ধারণ করে আছে যুগ যুগ ধরে। বারো মাসে তেরো পার্বণের ন্যায় হিন্দুধর্মে লেগে আছে ঋতুভিত্তিক উৎসব। এই সকল উৎসব ধর্মের গণ্ডী অতিক্রম করে সর্বমানবীয়, উদার দার্শনিক তত্ত্বে ঋদ্ধ। প্রাচীন ঋষিরা তাই হিন্দু ধর্মকে ক্ষুদ্র গণ্ডীতে আবদ্ধ করেনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর ইতিহাস হিন্দু ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোত জড়িত। হোলিও তেমনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির উত্থানের ইতিহাস।
দৈত্যরাজ হিরণ্যকিশপুর কাহিনি আমরা সকলে জানি। ভক্ত প্রহ্লাদ অসুর বংশে জন্ম নিয়েও পরম ধার্মিক ছিলেন। তাঁকে যখন বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও হত্যা করা যাচ্ছিল না তখন হিরণ্যকিশপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ হোলিকা এই বর পেয়েছিল যে আগুনে তার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু অন্যায় কাজে শক্তি প্রয়োগ করায় হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলে প্রহ্লাদের কোনো ক্ষতি হয় না কিন্তু হোলিকা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বিষ্ণু ভক্ত প্রহ্লাদের এই অক্ষতের আনন্দ উৎসবে পরিণত হয়। এই দহনকে হোলিকা দহন বলা হয়।
অন্যদিক বসন্তের পূর্ণিমার এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেশি নামক অসুরকে বধ করেন। কোথাও কোথাও অরিষ্টাসুর নামক অসুর বধের কথাও আছে। অন্যায়কারী, অত্যাচারী এই অসুরকে বধ করার পর তার রক্ত ছিটিয়ে সকলে আনন্দ করে। এই অন্যায় শক্তিকে ধ্বংসের আনন্দ মহানন্দে পরিণত হয়।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে হোলির রীতি ও বিশ্বাস বিভিন্ন। বাংলা অঞ্চলে বৈষ্ণব প্রাধান্য রীতি প্রচলিত। রঙ উৎসবের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে। শুকনো গাছের ডাল, কাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে সু-উচ্চ একতা থাম বানিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করে ‘হোলিকা দহন’ হয়। পরের দিন রঙ খেলা। বাংলাতেও দোলের আগের দিন এইরকম হয় যদিও তার ব্যাপকতা কম, একে আমরা বলি ‘চাঁচর’। এই চাঁচরেরও অন্যরকম ব্যাখ্যা আছে। দোল আমাদের ঋতুচক্রের শেষ উৎসব। পাতাঝরার সময়, বৈশাখের প্রতীক্ষা। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। পুরনো জঞ্জাল, রুক্ষতা, শুষ্কতা সরিয়ে নতুনের আহ্বান হচ্ছে এই হোলি। বাংলায় দোলের আগের দিন ‘চাঁচর’ উদ্যাপনকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়।
অঞ্চল ভেদে হোলি বা দোল উদ্যাপনের ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত লোককথার ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু উদ্যাপনের রীতি এক। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন পূর্বভারতে আর্যরা এই উৎসব পালন করতেন। যুগে যুগে এর উদ্যাপন রীতি পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। পুরাকালে বিবাহিত নারী তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রঙের উৎসব করতেন।
দোল হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব। নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ও ‘জৈমিনি মীমাংসা’য় রঙ উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায়। ৭ম শতাব্দীর এক শিলালিপিতে রাজা হর্ষবর্ধন কর্তৃক ‘হোলিকোৎসব’ পালনের উল্লেখ পাওয়া যায়। হর্ষবর্ধনের নাটক ‘রত্মাবলী’তেও হোলিকোৎসবের উল্লেখ আছে। এমনকি আল বেরুনীর বিবরণে জানা যায় মধ্যযুগে কোন কোন অঞ্চলে মুসলমানরাও হোলিকোৎসবে সংযুক্ত হত।
মধ্যযুগের বিখ্যাত চিত্রশিল্পগুলোর অন্যতম প্রধান বিষয় রাধা-কৃষ্ণের রঙ উৎসব। এই রাধা-কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে হোলির যে অতি বৈষ্ণবীয় আচার তা অবশ্যই প্রশ্নযুক্ত। কেননা এটি শ্রীকৃষ্ণের জীবন ইতিহাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। শ্রীকৃষ্ণ ১২ বছর বয়সে বৃন্দাবন ত্যাগ করার পর সেখানে তাঁর যাওয়াই হয়নি। অন্যদিকে বহু গবেষক রাধার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছেন। শ্রীকৃষ্ণের ঝুলন থেকে দোল কথার উদ্ভব।
সে যাই হোক রাধা-কৃষ্ণ তত্ত্বকে দাড় করিয়ে বিপরীত লিঙ্গের মাঝে অবাধ হোলি খেলা অবশ্যই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সমর্থনযোগ্য নয়। আবার বিষাক্ত রঙের ব্যবহারও উচিত নয়। এমনকি বহু জায়গায় হোলিকা দহনের নামে গাছপালা যথেচ্ছ কেটে ফেলা হয় তাও উচিত নয়। তাই হোলি নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের অসামাজিকতা পরিহার করা জরুরী।
হোলি সম্পর্কে বড়ো একটি তথ্য সকলে এড়িয়ে যায়। ধর্ম ও সমাজ ওতোপ্রোত জড়িত। আর একটি উৎসব বা দিন আরও পবিত্র হয়ে ওঠে যদি উক্ত দিনে পৃথিবী মহান পুরুষের জন্ম দেয়। বাঙালি তথা হিন্দু সমাজের অন্যতম মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্যের জন্মতিথি হচ্ছে এই পূর্ণিমা তিথি তথা হোলি তিথি। এই মহান পুরুষের জন্ম উৎসবের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পৃথিবী পাপে ভারাক্রান্ত হলে ঈশ্বর সেই ভার লাঘব করেন অবতাররূপে। বর্তমান পৃথিবী এমন অন্যায় ভারে ভারাক্রান্ত তাই মানুষের মধ্যে প্রয়োজন শুভবোধ, প্রতিবাদী শক্তি, সংগ্রাম ও সত্যের প্রতি সমর্পণ। ধর্মীয় গণ্ডী ছাড়িয়ে হোলি উৎসবের এই মহান আদর্শ আমাদের পাপ-পঙ্কিল ধরণীকে পরশ পাথরে সত্য করে তুলুক। অন্যায়কে পরাজিত করার আনন্দে সকলের মন রাঙিয়ে উঠুক। মহানপুরুষের আবির্ভাবে সকলের মন আনন্দে নেচে উঠুক অবশ্যই অসামজিকতায় নয়।
রবীন্দ্রনাথের সুরে হোলির রঙ আমাদের মর্মে লাগুক-
ওরে গৃহবাসী খোল, দ্বার খোল, লাগলো যে দোল ।
স্থলে জলে বনতলে লাগলো যে দোল ।
দ্বার খোল, দ্বার খোল ।।
উৎস : সনাতন ধর্ম জিজ্ঞাসা, সঞ্জয় সরকার, সম্পদ দাশ, গ্রন্থকুটির প্রকাশনী, শ্রীপঞ্চমী ১৪২৩

হোলি বা দোল উৎসব এর সঠিক ইতিহাস কি?

উত্তর:
সবাই হোলি নিয়ে ছবি ভরা পোস্ট দিচ্ছে। কিন্তু হোলি কি? কেন? এ প্রশ্নগুলো কি কারো মাথাতেই খেলছে না? বর্তমান সময়ে রঙের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, বিপরীত লিঙ্গীয় মানুষের মাখামাখি এমনকি শ্রীকৃষ্ণ রাধার হোলি মাখা ছবিগুলো দেখে অনেকেই বলেছেন এর নামই কি হোলি?!
দৈত্যরাজ হিরণ্যকিশপুর কাহিনি আমরা সকলে জানি। ভক্ত প্রহ্লাদ অসুর বংশে জন্ম নিয়েও পরম ধার্মিক ছিলেন। তাঁকে যখন বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও হত্যা করা যাচ্ছিল না তখন হিরণ্যকিশপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুলে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ হোলিকা এই বর পেয়েছিল যে আগুনে তার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু অন্যায় কাজে শক্তি প্রয়োগ করায় হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলে বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ অগ্নিকুণ্ড থেকেও অক্ষত থেকে যায় আর ক্ষমতার অপব্যবহারে হোলিকার বর নষ্ট হয়ে যায় এবং হোলিকা পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়, এই থেকেই হোলি কথাটির উৎপত্তি ।
অন্যদিক বসন্তের পূর্ণিমার এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেশি নামক অসুরকে বধ করেন। কোথাও কোথাও অরিষ্টাসুর নামক অসুর বধের কথাও আছে। অন্যায়কারী, অত্যাচারী এই অসুরকে বধ করার পর সকলে আনন্দ করে। এই অন্যায় শক্তিকে ধ্বংসের আনন্দ মহাআনন্দে পরিণত হয়।
অঞ্চল ভেদে হোলি বা দোল উদযাপনের ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা এর সঙ্গে সংপৃক্ত লোককথার ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু উদযাপনের রীতি এক ।বাংলায় আমরা বলি ‘দোলযাত্রা’ আর পশ্চিম ও মধ্যভারতে ‘হোলি’,। রঙ উৎসবের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে । শুকনো গাছের ডাল, কাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে সু-উচ্চ একতা থাম বানিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করে ‘হোলিকা দহন’ হয় । পরের দিন রঙ খেলা । বাংলাতেও দোলের আগের দিন এইরকম হয় যদিও তার ব্যাপকতা কম – আমরা বলি ‘চাঁচর’ । এই চাঁচরেরও অন্যরকম ব্যাখ্যা আছে । দোল আমাদের ঋতুচক্রের শেষ উৎসব । পাতাঝরার সময়, বৈশাখের প্রতীক্ষা। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে । পুরনো জঞ্জাল, রুক্ষতা, শুষ্কতা সরিয়ে নতুনের আহ্বান হচ্ছে এই হোলি। বাংলায় দোলের আগের দিন ‘চাঁচর’ উদযাপনকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয় ।
আমাদের অনেক ধর্মীয় উৎসবেই আঞ্চলিক লোক-সংস্কৃতি ও রীতির প্রভাব দেখা যায়, হোলিও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলার দোলযাত্রায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব রীতির প্রাধান্য পায়। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন পূর্বভারতে আর্যরা এই উৎসব পালন করতেন । যুগে যুগে এর উদযাপন রীতি পরিবর্তিত হয়ে এসেছে । পুরাকালে বিবাহিত নারী তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রঙের উৎসব করতেন ।
দোল হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব । নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ও ‘জৈমিনি মীমাংশা’য় রঙ উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায় । ৩০০ খৃষ্টপূর্বাব্দের এক শিলালিপিতে রাজা হর্ষবর্ধন কর্তৃক ‘হোলিকোৎসব’পালনের উল্লেখ পাওয়া যায় । হর্ষবর্ধনের নাটক ‘রত্নাবলী’তেও হোলিকোৎসবের উল্লেখ আছে । এমনকি আল বেরুণীর বিবরণে জানা যায় মধ্যযুগে কোন কোন অঞ্চলে মুসলমানরাও হোলিকোৎসবে সংযুক্ত হতেন ।
মধ্যযুগের বিখ্যাত চিত্রশিল্পগুলির অন্যতম প্রধান বিষয় রাধা-কৃষ্ণের রঙ উৎসব । এই রাধা-কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে হোলির যে অতি বৈষ্ণবীয় আচার তা অবশ্যই প্রশ্নযুক্ত। কেননা এটি শ্রীকৃষ্ণের জীবন ইতিহাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কেননা শ্রীকৃষ্ণ ১০ বছর বয়সে বৃন্দাবন ত্যাগ করার পর সেথানে তার যাওয়াই হয়নি। অন্যদিকে বহু গবেষক রাধার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছেন। শ্রীকৃষ্ণের ঝুলন থেকে দোল কথার উদ্ভব।
সে যাই হোক রাধা-কৃষ্ণ তত্ত্বকে দাড় করিয়ে বিপরীত লিঙ্গের মাঝে অবাধ হোলি খেলা অবশ্যই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সমর্থন যোগ্য নয়। আবার বিষাক্ত রঙের ব্যবহারও উচিত নয়। এমনকি বহু জায়গায় হোলিকা দহনের নামে গাছপালা যথেচ্ছ কেটে ফেলা হয় তাও উচিত নয়। তাই হোলি নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের অসামাজিকতা পরিহার করা জরুরী।
হোলি সম্পর্কে বড়ো একটি তথ্য সকলে এড়িয়ে যায়। ধর্ম ও সমাজ ওতোপ্রোত জড়িত। আর একটি উৎসব বা দিন আরও পবিত্র হয়ে ওঠে যদি উক্ত দিনে পৃথিবী মহান পুরুষের জন্ম দেয়। বাঙালি তথা হিন্দু সমাজের অন্যতম মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্যের জন্মতিথি হচ্ছে এই পূর্ণিমা তিথি তথা হোলি তিথি। এই মহান পুরুষের জন্ম উৎসবের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যায়কে পরাজিত করার আনন্দে সকলের মন রাঙিয়ে উঠুক। মহানপুরুষের আবির্ভাবে সকলের মন আনন্দে নেচে উঠুক অবশ্যই অসামজিকতায় নয়।
আংশিক ঋণস্বীকার : নানা কথায় হোলি, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

দোল পূর্ণিমা প্রসঙ্গ

আজকের পূর্ণিমা তিথিকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়। আবার একই সঙ্গে এই তিথিতে মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যদেবের জন্ম দিবস বলে একে বৈষ্ণবরা গৌরপূর্ণিমা নামেও অভিহিত করে। সসকল ভক্তবৃন্দকে দোলযাত্রা এবং গৌরপূর্নিমার প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
পণ্ডিতেরা বলেন, রাধাকৃষ্ণের দোলনায় দোলা বা দোলায় গমন করা থেকেই ‘দোল’ কথাটির উৎপত্তি
প্রকৃতির কবি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,
"ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল লাগল যে দোল।
স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল।"
এই দোল কথাটি প্রকৃত তাৎপর্য্য, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তো সর্বদাই দোদুল্যমান। এই জগৎ সংসারকে দোলাচ্ছেন স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। আমরাও প্রত্যেকে দুলছি | তাই উৎসবটি 'দোল' নামে পরিচিত।