Hare Krishna

Hare Krishna
Welcome to ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ

Wednesday, January 8, 2020

শ্রীমদভগবদগীতায় অর্জুনের ১৬ টি প্রশ্ন।

❶ হে কেশব! স্থিতপ্রজ্ঞ অর্থাৎ অচলা বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের লক্ষণ কি? তিনি কিভাবে কথা বলেন, কিভাবে অবস্থান করেন এবং কিভাবেই বা তিনি বিচরণ করেন? (২/৫৪)

পরমেশ্বর ভগবান বললেন--- হে পার্থ! জীব যখন মানসিক জল্পনা-কল্পনা থেকে উদ্ভূত সমস্ত মনোগত কাম পরিত্যাগ করে এবং তার মন যখন এভাবে পবিত্র হয়ে আত্মাতেই পূর্ণ পরিতৃপ্তি লাভ করে, তখনই তাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়।

❷ হে জনার্দন! হে কেশব! যদি তোমার মতে কর্ম অপেক্ষা ভক্তি-বিষয়িনী বুদ্ধি শ্রেয়তর হয়, তা হলে এই ভয়ানক যুদ্ধে নিযুক্ত হওয়ার জন্য কেন আমাকে প্ররোচিত করছ? তুমি যেন দ্ব্যর্থবোধক বাক্যের দ্বারা আমার বুদ্ধি বিভ্রান্ত করছ। তাই, দয়া করে আমাকে নিশ্চিতভাবে বল কোনটি আমার পক্ষে সবচেয়ে শ্রেয়ষ্কর। (৩/১-২)

পরমেশ্বর ভগবান বললেন--- কেবল কর্মের অনুষ্ঠান না করার মাধ্যমে কর্মফল থেকে মুক্ত হওয়া যায় না, আবার কর্মত্যাগের মাধ্যমেও সিদ্ধি লাভ করা যায় না। সকলেই মায়াজাত গুণসমূহের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অসহায়ভাবে কর্ম করতে বাধ্য হয়; তাই কর্ম না করে কেউই ক্ষণকালও থাকতে পারে না। যে ব্যক্তি পঞ্চ-কর্মেন্দ্রিয় সংযত করেও মনে মনে শব্দ, রস আদি ইন্দ্রিয় বিষয়গুলি স্মরণ করে, সেই মূঢ় অবশ্যই নিজেকে বিভ্রান্ত করে এবং তাকে মিথ্যাচারী ভণ্ড বলা হয়ে থাকে। কিন্তু যিনি মনের দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করে অনাসক্তভাবে কর্মযোগের অনুষ্ঠান করেন, তিনি পূর্বোক্ত মিথ্যাচারী অপেক্ষা অনেক গুণে শ্রেষ্ঠ। তুমি শাস্ত্রোক্ত কর্মের অনুষ্ঠান কর, কেন না কর্মত্যাগ থেকে কর্মের অনুষ্ঠান শ্রেয়। কর্ম না করে কেউ দেহযাত্রাও নির্বাহ করতে পারে না।

❸ হে বার্ষ্ণেয়! মানুষ কার দ্বারা চালিত হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেন বলপূর্বক নিয়োজিত হয়েই পাপাচরেণ প্রবৃত্ত হয়? (৩/৩৬)

পরমেশ্বর ভগবান বললেন--- হে অর্জুন! রজোগুণ থেকে সমুদ্ভূত কামই মানুষকে এই পাপে প্রবৃত্ত করে এবং এই কামই ক্রোধে পরিণত হয়। কাম সর্বগ্রাসী ও পাপাত্মক; কামকেই জীবের প্রধান শত্রু বলে জানবে।

❹ অর্জুন বললেন--- সূর্যদেব বিবস্বানের জন্ম হয়েছিল তোমার অনেক পূর্বে। তুমি যে পুরাকালে তাঁকে এই জ্ঞান উপদেশ করেছিলে, তা আমি কেমন করে বুঝব? (৪/৪)

পরমেশ্বর ভগবান বললেন--- হে পরন্তপ অর্জুন! আমার ও তোমার বহু জন্ম অতীত হয়েছে। আমি সেই সমস্ত জন্মের কথা স্মরণ করতে পারি, কিন্তু তুমি পার না। যদিও আমি জন্মরহিত এবং আমার চিন্ময় দেহ অব্যয় এবং যদিও আমি সর্বভূতের ঈশ্বর, তবুও আমার অন্তরঙ্গা শক্তিকে আশ্রয় করে আমি আমার আদি চিন্ময় রূপে যুগে যুগে অবতীর্ণ হই। হে ভারত! যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যূত্থান হয়, তখন আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই। সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।

❺ হে শ্রীকৃষ্ণ! প্রথমে তুমি আমাকে কর্ম ত্যাগ করতে বললে এবং তারপর কর্মযোগের অনুষ্ঠান করতে বললে। এই দুটির মধ্যে কোনটি অধিক কল্যাণকর, তা সুনিশ্চিতভাবে আমাকে বল। (৫/১)

পরমেশ্বর ভগবান বললেন--- কর্মত্যাগ ও কর্মযোগ উভয়ই মুক্তিদায়ক। কিন্তু, এই দুটির মধ্যে কর্মযোগ কর্মসন্ন্যাস থেকে শ্রেয়।

❻ অর্জুন বললেন--- হে মধুসূদন! তুমি সর্বত্র সমদর্শনরূপ যে যোগ উপদেশ করলে, মনের চঞ্চল স্বভাববশত আমি তার স্থায়ী স্থিতি দেখতে পাচ্ছি না।
হে কৃষ্ণ! মন অত্যন্ত চঞ্চল, শরীর ও ইন্দ্রিয় আদির বিক্ষেপ উৎপাদক, দুর্দমনীয় এবং অত্যন্ত বলবান, তাই তাকে নিগ্রহ করা বায়ুকে বশীভূত করার থেকেও অধিকতর কঠিন বলে আমি মনে করি। (৬/৩৩-৩৪)

পরমেশ্বর ভগবান বললেন--- হে মহাবাহো! মন যে দুর্দমনীয় ও চঞ্চল তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু হে কৌন্তেয়! ক্রমশ অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা মনকে বশীভূত করা যায়। অসংযত চিত্ত ব্যক্তির পক্ষে আত্ম-উপলব্ধি দুষ্প্রাপ্য। কিন্তু যার মন সংযত এবং যিনি যথার্থ উপায় অবলম্বন করে মনকে বশ করতে চেষ্টা করেন, তিনি অবশ্যই সিদ্ধি লাভ করেন। সেটিই আমার অভিমত।

❼ অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন--- হে কৃষ্ণ! যিনি প্রথমে শ্রদ্ধা সহকারে যোগে যুক্ত থেকে পরে চিত্তচাঞ্চল্য হেতু ভ্রষ্ট হয়ে যোগে সিদ্ধিলাভ করতে না পরেন, তবে সেই ব্যর্থ যোগীর কি গতি লাভ হয়? হে মহাবাহো কৃষ্ণ! কর্ম ও যোগ হতে ভ্রষ্ট ব্যক্তি ব্রহ্ম লাভের পথ থেকে বিমূঢ় হয়ে যে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে, সে কি ছিন্ন মেঘের মতো একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে? হে কৃষ্ণ! তুমিই কেবল আমার এই সংসয় দুর করতে সমর্থ। কারন তুমি ছারা আর কেউ এই সংসয় দূর করতে সমর্থ। কারণ, তুমি ছাড়া আর কেউই আমার এই সংশয় দূর করতে পারবে না। (৬/৩৭-৩৮-৩৯)

পরমেশ্বর ভগবান বললেন--- হে পার্থ! শুভানুষ্ঠানকারীপরমার্থবিদের ইহলোকে ও পরলোকে কোন দুর্গতি হয় না। হে বৎস্য! তার কারণ, কল্যাণকারীর কখনও অধোগতি হয় না। যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি পুণ্যবানদের প্রাপ্য স্বর্গাদি লোকসমূহে বহুকাল বাস করে সদাচারী ব্রাহ্মণদের গৃহে অথবা শ্রীমান ধনী বণিকদের গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। হে কুরুনন্দন! সেই প্রকার জন্মগ্রহণ করার ফলে তিনি পুনরায় তাঁর পূর্ব জন্মকৃত পারমার্থিক চেতনার বুদ্ধিসংযোগ লাভ করে সিদ্ধি লাভের জন্য পুনরায় যত্নবান হন। তিনি পূর্ব জন্মের অভ্যাস বশে যেন অবশ হয়ে যোগ-সাধনের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই প্রকার যোগশাস্ত্রের জিজ্ঞাসু পুরুষ বেদোক্ত সকাম কর্মমার্গকে অতিক্রম করেন, অর্থাৎ সকাম কর্মমার্গে যে ফল নির্দিষ্ট আছে, তার থেকে উৎকৃষ্ট ফল লাভ করেন। যোগী ইহজন্মে পূর্বজন্মকৃত যত্ন অপেক্ষা অধিকতর যত্ন করে পাপ মুক্ত হয়ে পূর্ব পূর্ব জন্মের সাধন সঞ্চিত সংস্কার দ্বারা সিদ্ধি লাভ করে পরম গাতি লাভ করেন।

❽ হে পুরুষোত্তম! ব্রহ্ম কি? অধ্যাত্ম কি? কর্ম কি? অধিভূত ও অধিদৈবই বা কাকে বলে? অনুগ্রহপূর্বক আমাকে স্পষ্ট করে বল। হে মধুসূদন! এই দেহে অধিযজ্ঞ কে, এবং এই দেহের মধ্যে তিনি কিরূপে অবস্থিত? মৃত্যুকালে জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তিরা কিভাবে তোমাকে জানতে পারেন? (৮/১-২)

পরমেশ্বর ভগবান বললেন--- নিত্য বিনাশ-রহিত জীবকে বলা হয় ব্রহ্ম এবং তার নিত্য স্বভাবকে অধ্যাত্ম বলে। ভূতগণের উৎপত্তি ও বৃদ্ধিকর সংসারই কর্ম। নশ্বর জড়া প্রকৃতি অধিভূত। সূর্য, চন্দ্র আদি সমস্ত দেবতাদের সমষ্টিরূপ বিরাট পুরুষকে অধিদৈব বলা হয়। আর দেহীদের দেহান্তরগত অন্তর্যামী রূপে আমিই অধিযজ্ঞ। মৃত্যুর সময়ে যিনি আমাকে স্মরণ করে দেহত্যাগ করেন, তিনি তৎক্ষণাৎ আমার ভাবই প্রাপ্ত হন। এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

❾ হে যোগেশ্বর! কীভাবে সর্বদা তোমার চিন্তা করলে আমি তোমাকে জানতে পারব? হে ভগবন্! কোন্ কোন্ বিবিধ আকৃতির মাধ্যমে আমি তোমাকে চিন্তা করব? হে জনার্দন! তোমার যোগ ও বিভূতি বিস্তারিতভাবে পুনরায় আমাকে বল। কারণ তোমার উপদেশামৃত শ্রবণ করে আমার পরিতৃপ্তি হচ্ছে না; আমি আরও শ্রবণ করতে ইচ্ছা করি। (১০/১৭-১৮)

পরমেশ্বর ভগবান বললেন--- হে অর্জুন, আমার দিব্য প্রধান প্রধান বিভূতিসমূহ তোমাকে বলব, কিন্তু আমার বিভূতিসমূহের অন্ত নেই। হে গুড়াকেশ! আমিই সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থিত পরমাত্মা। আমিই সর্বভূতের আদি, মধ্য ও অন্ত। আদিত্যদের মধ্যে আমি বিষ্ণু, জ্যোতিষ্কদের মধ্যে আমি কিরণশালী সূর্য, মরুতদের মধ্যে আমি মরীচি এবং নক্ষত্রদের মধ্যে আমি চন্দ্র। সমস্ত বেদের মধ্যে আমি সামবেদ, সমস্ত দেবতাদের মধ্যে আমি ইন্দ্র, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের মধ্যে আমি মন এবং সমস্ত প্রাণীদের মধ্যে আমি চেতনা। রুদ্রদের মধ্যে আমি শিব, যক্ষ ও রাক্ষসদের মধ্যে আমি কুবের, বসুদের মধ্যে আমি অগ্নি এবং পর্বতসমূহের মধ্যে আমি সুমেরু।

⑩ হে পরমেশ্বর! তোমার সমন্ধে যেরূপ বলেছ, যদিও আমার সম্মুখে তোমাকে সেই রূপেই দেখতে পাচ্ছি, তবুও হে পুরুষোত্তম! তুমি যেভাবে এই বিশ্বে প্রবেশ করেছ, আমি তোমার সেই ঐশ্বর্যময় রূপ দেখতে ইচ্ছা করি। হে প্রভু! তুমি যদি মনে কর যে, আমি তোমার এই বিশ্বরূপ দর্শন করার যোগ্য, তা হলে হে যোগেশ্বর! আমাকে তোমার সেই নিত্যস্বরূপ দেখাও। (১১/৩-৪)

শ্রীভগবান বললেন--- হে পার্থ! নানা বর্ণ ও নানা আকৃতি-বিশিষ্ট শত শত ও সহস্র সহস্র আমার বিভিন্ন দিব্য রূপসমূহ দর্শন কর। হে ভারত! দ্বাদশ আদিত্য, অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, ঊনপঞ্চাশ মরুত এবং অনেক অদৃষ্টপূর্ব আশ্চর্য রূপ দেখ।

⑪ হে উগ্রমূর্তি তুমি কে, কৃপা করে আমাকে বল। হে দেবশ্রেষ্ঠ। তোমাকে নমস্কার করি, তুমি প্রসন্ন হও। তুমি হচ্ছ আদিপুরুষ। আমি তোমার প্রবৃত্তি অবগত নই, আমি তোমাকে বিশেষভাবে জানতে ইচ্ছা করি। (১১/৩১)

শ্রীভগবান বললেন--- আমি লোকক্ষয়কারী প্রবৃদ্ধ কাল এবং এই সমস্ত লোক সংহার করতে এক্ষণে প্রবৃত্ত হয়েছি। তোমরা (পাণ্ডবেরা) ছাড়া উভয়-পক্ষীয় সমস্ত যোদ্ধারাই নিহত হবে।

⑫ অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন--- এভাবেই নিরন্তর ভক্তিযুক্ত হয়ে যে সমস্ত ভক্তেরা যথাযথভাবে তোমার আরাধনা করেন এবং যাঁরা ইন্দ্রিয়াতীত অব্যক্ত ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তাঁদের মধ্যে কারা শ্রেষ্ঠ যোগী। (১২/১)

শ্রীভগবান বললেন--- যাঁরা তাঁদের মনকে আমার সবিশেষ রূপে নিবিষ্ট করেন এবং অপ্রাকৃত শ্রদ্ধা সহকারে নিরন্তর আমার উপাসনা করেন, আমার মতে তাঁরাই সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী।

⑬ অর্জুন বললেন--- হে কেশব! আমি প্রকৃতি, পুরুষ, ক্ষেত্র, ক্ষেত্রজ্ঞ, জ্ঞান ও জ্ঞেয়--- এই সমস্ত তত্ত্ব জানতে ইচ্ছা করি। (১৩/১)

পরমেশ্বর ভগবান বললেন--- হে কৌন্তেয়! এই শরীর ক্ষেত্র নামে অভিহিত এবং যিনি এই শরীরকে জানেন, তাঁকে ক্ষেত্রজ্ঞ বলা হয়। হে ভারত! আমাকেই সমস্ত ক্ষেত্রের ক্ষেত্রজ্ঞ বলে জানবে এবং ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ সম্বন্ধে যে জ্ঞান, সেই জ্ঞানই আমার অভিমত। ১৩.১৮ তিনি সমস্ত জ্যোতিষ্কের পরম জ্যোতি। তাঁকে সমস্ত অন্ধকারের অতীত অব্যক্ত স্বরূপ বলা হয়। তিনিই জ্ঞান, তিনিই জ্ঞেয় এবং তিনিই জ্ঞানগম্য। প্রকৃতি ও পুরুষ উভয়ই অনাদি বলে জানবে। তাদের বিকার ও গুণসমূহ প্রকৃতি থেকেই উৎপন্ন বলে জানবে।

⑭ অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন--- হে প্রভু! যিনি এই তিন গুণের অতীত, তিনি কি কি লক্ষণ দ্বারা জ্ঞাত হন? তাঁর আচরণ কি রকম? এবং তিনি কিভাবে এই তিন গুণ অতিক্রম করেন? (১৪/২১)

পরমেশ্বর ভগবান বললেন--- হে পাণ্ডব! যিনি প্রকাশ, প্রবৃত্তি ও মোহ আবির্ভূত হলে দ্বেষ করেন না এবং সেগুলি নিবৃত্ত হলেও আকাক্ষা করেন না; যিনি উদাসীনের মতো অবস্থিত থেকে গুণসমূহের দ্বারা বিচলিত হন না; কিন্তু গুণসমূহ স্বীয় কার্যে প্রবৃত্ত হয়, এভাবেই জেনে অবস্থান করেন এবং তার দ্বারা চঞ্চলতা প্রাপ্ত হন না; যিনি আত্মস্বরূপে অবস্থিত এবং সুখ ও দুঃখে সম-ভাবাপন্ন; যিনি মাটির ঢেলা, পাথর ও স্বর্ণে সমদৃষ্টি-সম্পন্ন; যিনি প্রিয় ও অপ্রিয় বিষয়ে সমভাবাপন্ন; যিনি ধৈর্যশীল এবং নিন্দা, স্তুতি, মান ও অপমানে সম-ভাবাপন্ন; যিনি শত্রু ও মিত্র উভয়ের প্রতি সমভাব-সম্পন্ন এবং যিনি সমস্ত কর্মোদ্যম পরিত্যাগী---তিনিই গুণাতীত বলে কথিত হন।

⑮ অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন--- হে কৃষ্ণ! যারা শাস্ত্রীয় বিধান পরিত্যাগ করে শ্রদ্ধা সহকারে দেব-দেবীর পূজা করে, তাদের সেই নিষ্ঠা কি সাত্ত্বিক, রাজসিক না তামসিক? (১৭/১)

শ্রীভগবান বললেন--- দেহীদের স্বভাব-জনিত শ্রদ্ধা তিন প্রকার--- সাত্ত্বিকী, রাজসী ও তামসী। এখন সেই সম্বন্ধে শ্রবণ কর। হে ভারত! সকলের শ্রদ্ধা নিজ-নিজ অন্তঃকরণের অনুরূপ হয়। যে যেই রকম গুণের প্রতি শ্রদ্ধা যুক্ত, সে সেই রকম শ্রদ্ধাবান। সাত্ত্বিক ব্যক্তিরা দেবতাদের পূজা করে, রাজসিক ব্যক্তিরা যক্ষ ও রাক্ষসদের পূজা করে এবং তামসিক ব্যক্তিরা ভূত ও প্রেতাত্মাদের পূজা করে।

⑯ অর্জুন বললেন--- হে মহাবাহো! হে হৃষীকেশ! হে কেশিনিসূদন! আমি সন্ন্যাস ও ত্যাগের তত্ত্ব পৃথকভাবে জানতে ইচ্ছা করি। (১৮/১)

পরমেশ্বর ভগবান বললেন--- পণ্ডিতগণ কাম্য কর্মসমূহের ত্যাগকে সন্ন্যাস বলে জানেন এবং বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ সমস্ত কর্মফল ত্যাগকে ত্যাগ বলে থাকেন।

Wednesday, September 11, 2019

কেমন ভক্তি থাকলে ভগবানের দেখা পাবেন? জেনে নিন সেই রোমাঞ্চিত কৃষ্ণ কাহিনী

আমরা সকলেই জানি ভক্তদের সঙ্গে ভগবানের এক গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। এর উদাহরণ আমরা পুরাণ কাহিনী সূত্রে জেনেছি যেমন রাধা ও কৃষ্ণ লীলা। আজকে জানবো কি ভাবে ভগবানকে ভক্তি ভরে ডাকলে ভগবানের সাক্ষাত পাওয়া যায়। ভক্ত সুরদাস জন্ম থেকেই অন্ধ। তার দেখা শোনার জন্য কোনো লোক থাকত না। লাঠি হাতে কৃষ্ণ নাম জপ করতে করতে ভ্রমণ করে বেড়ায়। সংসারে একা দরিদ্র ভিক্ষুক। কোনো দিন খাবার জোটে আবার কোনো কোনো দিন জোটে না। কিন্তু তার দারিদ্রতা তার মনের আনন্দকে হরণ করতে পারে নি। কিন্তু তার মনের আত্মা পড়ে থাকে কৃষ্ণ নামে। মুখে দারিদ্র ভাব থাকলেও মনে আছে গম্ভীর আনন্দ এর সুখ। সে ঠিক করে যে করে হোক কৃষ্ণ দেখা পেতেই হবে। সে মনে করে কৃষ্ণ দেখা না পেলে তার জীবন বৃথা।
তাই সে রওনা হয় মথুরা পথে। অন্ধ হওয়া সত্বেও সে কেবল মাত্র লাঠি কে অবলম্বন করে মথুরা পথে গমন করে আর মুখে কৃষ্ণ নাম। রাস্তা তে কোনো বাঁধা বিপত্তি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। সে কৃষ্ণ নাম জপ করতে করতে গভীর অরন্যে প্রবেশ করে। আর রাস্তায় কোনও লোকের দেখা পেলে জিজ্ঞেস করে ভাই মথুরা কতো দূর। কেউ কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দেয় আবার কেউ কেউ দেয় না। বন্য পশুর পদধ্বনি শুনলেও জিজ্ঞাস করে মথুরা কত দূর। পথে মাঝে মাঝে কেউ জল দেয়, রুটি দেয়, পথে কেউ কেউ বলে মথুরা তো অনেক দূর তাতেও সে বলে প্রভুর দেখা পেতেই হবে। কঠিন পথ পার হতে গিয়ে অনেক বাধা বিপত্তি পার হতে গিয়ে অনেক আঘাত পেয়েছে কিন্তু তাতেও মুখে কৃষ্ণ নাম নিয়ে এগিয়ে চলে।
তার মনে আনন্দের জোয়ার মথুরাতে প্রভু কে দর্শন করবে। সব দুঃখ কষ্ট মুছে যায়। গভীর আনন্দ তাকে এত টাই দুর্বল হয়ে যায় যে চলতে চলতে মানুষহীন এক অরন্যে এসে পৌঁছায়। আর লক্ষহীন ভাবে এক কুঁয়োতে পড়ে যায়। কিন্তু সে আনন্দে গান গেয়ে যায় আর মুখে কৃষ্ণ নাম। কিন্তু কয়েক দিন পর ক্ষুধায় তার জীবন অনাড়ম্বর হয়ে গেছে। হঠাৎ একদিন এক বালক এক ঘটি দুধ নিয়ে বনের মধ্য দিয়ে
যাচ্ছিলো। গো গো শব্দ শুনে আসে। আর একটি লতা দিয়ে তাকে ওপরে তুলে আনে। আর বলে আমার জীবন দাতা তুমি কে, তারপর বালক টি বলে সুর দাস তুমি তিন দিন কিছু খাওনি এই নাও দুধ টুকু খাও।
তারপর দুধ পান করে বালকটির হাত ধরতেই তার সারা শরীর রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে এবং নয়ন ভোরে জল পড়তে শুরু করে। সুর দাস বললো বন্ধু এবার পরিচয় দাও এবার। বালকটি বললো আমি গোয়ালার ছেলে। এই পথে মথুরার উদ্দেশে যে সব যাত্রী যায় তাদের তৃষ্ণা দূর করে থাকি। সুর দাস তার গলা জড়িয়ে ধরে বললো আমি তো সেই গোয়ালার ছেলে কেই করে খুঁজছি। যদি তুমি এসে থাকো তো একবার তোমার শ্রী মুখ খানি দেখাও। বালকটি বললো তুমি তো অন্ধ কি করে দেখবে আমাকে। আচ্ছা আমি তোমাকে দৃষ্টি দান করলাম। চোখে হাত বলাতেই সুর দাসের দৃষ্টি ফিরে আসে, আর সে দেখতে পায় সামনে এক শ্যাম রুপি বালক মাথায় এক ময়ূর পালক, গলাতে বনমালা, কোমরে বাঁশি।
সুর দাস মোহিত হয়ে তার পদ চরণে লুটিয়ে পড়ল। বলল দেখা পেয়েছি প্রভু। আমার চোখ আজ ধন্য। আমার প্রথম দেওয়া দৃষ্টি দিয়ে আমি তোমাকেই দর্শন করলাম প্রভু। আজ আমি ধন্য। আর কার রূপ আমি দেখতে চাই না। এই ভাবে সুর দাস শ্রী কৃষ্ণের দর্শন পেয়ে ছিলেন। অর্থাৎ পবিত্র হৃদয়ে লক্ষ্য স্থির রেখে, যত বাধাই আসুক না কেন তা সত্ত্বেও ভগবানকে ডেকে গেলে নিশ্চয় ভগবান সদয় হবেন, তাঁর দেখা পাবেন।

Tuesday, September 10, 2019

সনাতন হিন্দু ধর্মের মূল গ্রন্থসমূহ

#বেদ ৪ টি- মন্ত্র সংখ্যা- ২০,৪৩৪ 
১.ঋগবেদ. মন্ত্রসংখ্যা- ১০,৫৮৯
২.সামবেদ. মন্ত্রসংখ্যা- ১,৮৯৩
৩.যজু:বেদ. মন্ত্র সংখ্যা- ১,৯৭৫
৪.অথর্ববেদ. মন্ত্রসংখ্যা- ৫,৯৭৭
#উপবেদ ৪ টি.
১. আয়ুর্বেদ. ২.ধনুর্বেদ. ৩.গন্ধর্ববেদ. ৪.অর্থশাস্ত্র.
#বেদাঙ্গ -৬ টি.
১.শিক্ষা- পাণিনী
২.কল্প- বিভিন্ন ঋষি সম্প্রদায়
৩.ব্যাকরণ- পাণিনী.
৪.নিরুক্ত- যাস্ক.
৫.ছন্দ- পিঙ্গলাচার্য.
৬.জ্যোতিষ- গর্ণ.
#বেদের উপাঙ্গ-৪ টি.
১.পুরাণ. ২.মীমাংসা. ৩.ন্যায়. ৪.ধর্মশাস্ত্র
#বেদের জ্ঞানকাণ্ড- ২ টি.
১.আরণ্যক. ২.উপনিষদ.
#আরণ্যক - ৪ টি. ১.ঐতেরেয়. ২.কৌষীতকী ৩.শতপথ ব্রহ্মণ. ৪.ছান্দোগ্য.
#উপনিষদ -১২ টি.
১.বৃহদারণ্যক মন্ত্র- ৪৩৫.
২.ছান্দোগ মন্ত্র- ৬৬৮
৩.তৈত্তিরীয় মন্ত্র- ৬৮.
৪.ঐতরেয় মন্দ্র- ৩৩
৫.ঈশোপনিষ মন্ত্র- ১৮
৬.কেন উপনিষদ- ৩৫
৭.কঠো উপনিষদ- ১১৯.
৮.প্রশ্ন উপনিষদ- ৬৭
৯.মুণ্ডকোপনিষদ- ৬৫.
১০.মাণ্ডুক্যউপনিষদ- ১২
১১.শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ. মন্ত্র. - ১১৩.
১২.কৌষীতকী উপনিষদ মন্ত্র. - ৪৯.
#ষড়_দর্শন -৬ টি.
১.সাংখ্যা দর্শন - মহর্ষি কপিল.
২.যোগ দর্শন- পাতঞ্জলি.
৩.ন্যায় দর্শন - গৌতম.
৪.বৈশেষিক দর্শন-কণাদ.
৫.পূর্ব মীমাংসা - জৈমিনী.
৬.উত্তর মীমাংসা বেদান্ত দর্শন- ব্যাসদেব.
#মীমাংসা - ২ টি.
১.কর্ম মীমাংসা ২.ব্রহ্ম মীমাংস বা ব্রহ্মসূত্র.
#স্মৃতি_সংহিতা(সমাজ ব্যবস্থাপক শাস্ত্র) ২০টি
১.মনু সংহিতা
২.অত্রি সংহিতা.
৩.বিষ্ণু সংহিতা.
৪.হরিত সংহিতা.
৫.যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতা.
৬.পরাশর সংহিতা.
৭.ব্যাস সংহিতা.
৮.উশনা সংহিতা.
৯.অঙ্গিরা সংহিতা.
১০.যম সংহিতা.
১১.অপস্তম্ভ সংহিতা
১২.সম্বর্ত সংহিতা.
১৩.কাত্যায়ন সংহিতা.
১৪.বৃহস্পতি সংহিতা.
১৫.শঙ্খ সংহিতা
১৬.লিখিত সংহিতা.
১৭.দক্ষ সংহিতা.
১৮.গৌতম সংহিতা.
১৯.শতাতপ সংহিতা.
২০.বশিষ্ট সংহিতা.
#পুরাণ - ২ টি.
১.মহাপুরাণ. ২.উপ-পুরাণ.
#মহা_পুরাণ -১৮টি.
১.ব্রহ্ম পুরাণ মন্ত্রসংখা-১০,০০০.
২.শিব পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-২৪,০০০.
৩.পদ্ম পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-৫৫,০০০.
৪.বিষ্ণু পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-২৩,০০০.
৫.ভাগবত মহাপুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-১৮,০০০.
৬.মার্কণ্ডেয় পুনাণ মন্ত্রসংখ্যা-৯,০০০.
৭.অগ্নি পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-৫,৪০০.
৮.ভবিষত পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-১৪,৫০০.
৯.ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-১৮ ,০০০.
১০.মৎস পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-১৪,০০০.
১১.লিঙ্গ পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-১১,০০০.
১২.বরাহ পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-২৪,০০০.
১৩.কুর্ম্ম পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-১৭,০০০.
১৪.গরুড় পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-১৯,০০০.
১৫.ব্রহ্মান্ড পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-১২,০০০.
১৬.নারদীয় পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-২৫,০০০
১৭.স্কন্ধ পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-৮১,১০১.
১৮.বামন পুরাণ মন্ত্রসংখ্যা-১০,০০০.
# #দেবী_ভাগবত(শাক্ত সম্প্রদায়)
# #শ্রীমদ্ভাগবদ(বৈষ্ণব সম্প্রদায়)
# #শ্রীমদ্ভাগবতগীতা মন্ত্রসংখ্যা-৭০০ শ্রেষ্ঠগ্রন্থ (৫ম বেদ)
# #শ্রীশ্রীচণ্ডী.মন্ত্রসংখ্যা-৭০০

Monday, September 9, 2019

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, হিন্দুরা কেন মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলে?

হিন্দুরা কেন মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলে? কবরও তো দিতে পারতো বা অন্যকিছু করতে পারতো। পুড়িয়ে ফেলা কি অমানবিক নয়? 
আমাদের অজ্ঞতার কারণে আমরা প্রশ্নটির সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হই।
প্রথমে যে ইনফরমেশনটি আপনার জানা প্রয়োজন তা হলো পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ হিন্দু-বৌদ্ধ রীতি অনুসরণ করে অর্থাত মৃতদেহ পুড়িয়ে সৎকার করে। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত জাতি জাপান থেকে শুরু করে চীন, কুরিয়া, ভারত ও অন্যান্য জাতি এই রীতি অনুসরণ করে। তাহলে আপনি প্রথমত: পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন :
১. পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত জাতি জাপানিরা কি তাহলে অমানবিক ? পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কি অমানবিক ? যদি এই অর্ধেক মানুষ অমানবিক হয় তবে এদের মধ্যে কেন আমরা সবচেয়ে কম হানাহানি দেখতে পাই ? আসুন এবার প্রকৃত উত্তরের দিকে যায়।
২. হিন্দুধর্মে কবর দেয়া বা সমাধি দেয়া নিষিদ্ধ নয়। স্মৃতিশাস্ত্রে স্পষ্টভাবেই এটা অনুমোদিত। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মাঝে এখনও এটা প্রচলিত আছে। যেমন- নাথ বা যোগী সম্প্রদায় এবং সন্ন্যাসীদেরকে সমাধি দেয়া হয়। অনেক জায়গায় দেখা যায় কারও অপমৃত্যু হলে তার শব সমাধি দেয়া হয়, পোড়ানো হয় না।
৩. আমরা কথ্য ভাষায় ‘লাশ পোড়ানো’ বলি, কিন্তু শাস্ত্রীয় ভাষায় এটা ‘অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া’। এটা আবার কী? অন্ত+ইষ্টি=অন্ত্যেষ্টি। ইষ্টি মানে যজ্ঞ। অন্ত্যেষ্টি হলো জীবনের শেষ যজ্ঞ। আমরা জানি, আমাদের সুপ্রাচীন পূর্বপুরুষদের বৈদিক সমাজ ছিল যজ্ঞপ্রধান। জীবনের শুরু ‘গর্ভাধান’ থেকে জীবনের শেষ ‘দেহত্যাগ’ সবই হতো ঈশ্বরকে উদ্দেশ্য করে। জীবৎকালে প্রতিদিনই পঞ্চমহাযজ্ঞ করতে হতো (এখনও করার বিধান)। এছাড়া অগ্নিহোত্র যজ্ঞের মতো বিবিধ যজ্ঞে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে ‘হবি’ (বর্তমানে পূজায় অর্ঘ্য নিবেদনের মতো) উৎসর্গ করা হতো। এ হলো ঈশ্বরের দেয়া জীবন ও দেহ দ্বারা ঈশ্বরের সৃষ্ট প্রকৃতির উপাদানসমূহ ভোগ করার প্রেক্ষিতে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতাপূর্বক তাঁর উপাসনা করা। তাই অন্ত্যেষ্টি তথা জীবনের শেষ যজ্ঞে ঈশ্বরপ্রদত্ত এই দেহখানি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যেই ‘হবি’ বা অর্ঘ্যরূপে উৎসর্গ করা হয়। এটা সত্যিই চমৎকার একটা ব্যাপার!
৪. প্রাচীন দর্শন অনুযায়ী বিশ্বচরাচর তথা আমাদের দেহও পাঁচটি ভূত বা উপাদান দ্বারা তৈরি। একে ‘পঞ্চভূত’ বলে। এগুলো হলো- ক্ষিতি (মাটি), অপ (জল), তেজ (আগুন), মরুৎ (বাতাস), ব্যোম (আকাশ বা শূন্যস্থান)। যারা বলেন ‘মাটির দেহ’ বা দেহ শুধু মাটি দিয়ে তৈরি, তাই একে মাটির সাথেই মিশিয়ে দেয়া উচিৎ, তারা অবশ্যই ভুল বলেন। বাস্তবে দেহ এই পাঁচটি উপাদানের সমষ্টি। শবদাহ করার মাধ্যমে দেহকে এই ৫টি উপাদানেই মিশিয়ে দেয়া হয় প্রত্যক্ষভাবে। দাহ শেষে অবশিষ্টাংশ জলে বিসর্জন দেয়া হয়। এজন্য শ্মশান সর্বদাই জলাশয়ের পাশে হয়ে থাকে। অপরদিকে সমাধি বা কবর দিলে দেহ পঞ্চভূতে লীন হয় বটে, তবে পরোক্ষ ও ধাপে ধাপে। কারণ দেহ মাটির সাথে মেশে পঁচন প্রক্রিয়ায়। কোটি কোটি অনুজীব, পোকা-মাকড়ের খাবারে পরিণত হয় দেহ। এভাবে পঁচে গলে মাটিতে মেশানোই বরং দাহ করার চেয়ে বেশি অমানবিক মনে হয়। একটা মজার তথ্য দিই। অনেক সময় আমরা বলি, লোকটা তো মরে ভূত হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে সে প্রকৃতিতে (পঞ্চভূতে) লীন হয়েছে -এটাই বুঝতে হবে।
৫. মৃত্যু হয় দেহের; আত্মার নয়। অবিনাশী আত্মা অজর, অমর, অক্ষয়, অব্যয়। এটা জগদীশ্বর পরমাত্মার অংশ। (‘বিদ্রোহী’ কবিতার কয়েক লাইন মনে পড়ে কি?) জড় প্রকৃতির পঞ্চভূতে গড়া দেহ ফিরে যায় পঞ্চভূতে, আর জীবাত্মা ফিরে যায় পরমাত্মাতে। (মৃত্যুর পরে অবশ্যই আর কখনোই আপনি পুরনো দেহে ফিরে আসবেন না, বা কোন প্রকার শাস্তি/আজাব ভোগ করবেন না। শবদাহ করার পরে/মাটিতে মিশে যাওয়ার পরে নিশ্চয়ই লীন হওয়া দেহকে শাস্তি/আজাব যৌক্তিকভাবে সম্ভব নয়। )
৬. মৃত্যু প্রকৃতপক্ষে শোকের কোন ব্যাপার নয়। তীর্থস্থান বেনারস বা কাশীতে মৃত্যুও একটা উৎসবের ব্যাপার। “জাতস্য হি ধ্রুবর্মৃত্যো ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ”-গীতা। যে জন্মেছে তার মৃত্যু নিশ্চিত, যে মরেছে তার জন্মও নিশ্চিত। অতএব, দেহান্তরের নিছক সাধারণ ঘটনায় শোক কেন? বরং জরাজীর্ণ রোগশোকে আক্রান্ত দেহ ছেড়ে জীবাত্মার নতুন সুস্থ-সুন্দর দেহে জীবন আরম্ভের প্রাক্কালে মৃতকে হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানানোই উচিত।

সনাতন ধর্মে দেবদেবীর সংখ্যা কত?

বেদে ৩৩ কোটি দেব-দেবীর উল্লেখ নেই কিন্তু ৩৩ ধরনের দেব-দেবীর উল্লেখ রয়েছে। সংস্কৃততে কোটি অর্থ হচ্ছে ধরন বা প্রকার। ৩৩ কোটি (সংখ্যা) না, ৩৩ প্রকার দেব-দেবীা আছে সনাতন ধর্মে ।
সনাতন ধর্মের অপপ্রচার এটাই যে হিন্দুদের ৩৩ কোটি দেব-দেবী আর অনভিজ্ঞ যারা তারাও বলে আমাদের ৩৩ কোটি (সংখ্যায়) দেব-দেবী । সত্যিটা এই যে মোট ৩৩ প্রকার দেব-দেবী আছে সনাতন ধর্মে ।
.
এই ৩৩ ধরনের দেব-দেবীর মধ্যে রয়েছেন...
১২ প্রকার হল----------------------------------------------------
আদিত্য-ধাতা, মিত, আযমা, শুক্রা, বরুন, অংশ, ভাগ, বিবস্বান, পুষ, সবিত্রা, তবাস্থা এবং বিষ্ণু ।
.
৮ প্রকার হল-----------------------------------------------------
বাসু-ধর, ধ্রুব, সোম, অহ, অনিল, অনল, প্রত্যুষ এবং প্রভাষ ।
.
১১ প্রকার হল----------------------------------------------------
রুদ্র-হর, বহুরুপ, ত্রয়ম্বক, অপরাজিতা, বৃষাকাপি, শমভু, কপার্দী, রেবাত, মৃগব্যাধ, শর্বা এবং কপালী ।
.
২ প্রকার হল------ অশ্বিনী এবং কুমার ।
.
মোট ১২+৮+১১+২=৩৩
জয় শ্রীকৃষ্ণ

সংসারটা হচ্ছে মধুচাক আর বিষয়- আশয় হচ্ছে সর্প স্বরুপ

একদিন যুধিষ্ঠির ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করলেন -
ভগবান তুমি তো তোমার মোহন বাঁশির সুরে সকলকেই আকর্ষণ করছো।
তবু্ও সবাই কি সেই বাঁশির সুরে আকৃষ্ট হচ্ছে?
শ্রীকৃষ্ণ সেই সময় যুধিষ্ঠিরের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিলেন না।
অপরাহ্নে তিনি যুধিষ্ঠিরকে সঙ্গে নিয়ে একটা বনের মধ্যে বেড়াতে গেলেন ।
বনের মধ্যে একটা গাছে মৌচাক ছিল। চাকের মধ্য থেকে ফোঁটা ফোঁটা মধু ঝরে পড়ছিল।
একটি লোক নিচে দাঁড়িয়ে সেই মধু হাঁ করে খাচ্ছিল। মধু পানে সেই ব্যক্তি এমনি মত্ত হয়েছিল যে, তার বাহ্য জ্ঞান একরকম রহিত হয়েছিল।
একটি প্রকাণ্ড অজগর সর্প মুখ হাঁ করে ওই লোকটার দিকে আসছিল।
যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণকে বললেন -- "এ লোকটিকে তো এখনি সাপে খেয়ে ফেলবে।"
শ্রীকৃষ্ণ বললেন - "লোকটিকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে ডাকুন।"
যুধিষ্ঠির লোকটিকে ডাকতে লাগলেন। কিন্তু লোকটি মধু পানে এমন মত্ত ছিল যে, যুধিষ্ঠিরের ডাক শুনতেই পেল না।
যুধিষ্ঠির পুনরায় লোকটির কাছে গিয়ে চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন।
অনেকক্ষণ পর লোকটি বললো- " আর এক ফোঁটা। " কিন্তু এই অবসরে লোকটিকে সাপ গ্রাস করে ফেললো।
শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন -
" আপনি সে-সময় আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন
কেন সবাই আমার বাঁশির সুরে আকৃষ্ট হয় না "
আপনি তো এই লোকটিকে এতো ডাকলেন কিন্তু আপনার ডাক এই লোকটি শুনলো না কি ?
# শিক্ষনীয়হলো : সংসারটা হচ্ছে মধুচাক আর বিষয়- আশয় হচ্ছে সর্প স্বরুপ।
সংসারের মধুপানে মত্ত হয়ে আমরা ভগবানের ডাক শুনতে পাচ্ছি না।
আমরা কেবল বলছি , আর কদিন পরে ছেলে উপযুক্ত হলেই, তার হাতে সংসারের ভার দিয়ে বাকি জীবনটা কেবল ভগবানের নাম করেই কাটাবো।
ছেলে উপযুক্ত হলে বললাম, পৌত্রের মুখ দেখতে পেলেই আমার সংসারের স্বাদ মিটে যেত।
পৌত্রের মুখ দেখতে পেয়ে বললাম, পৌত্রের বিবাহ দিতে পারলেই আমার সব কাজ শেষ।
এরূপ বলতে বলতেই মৃত্যু রূপ সর্প এসে সব গ্রাস করে ফেলে ।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে রাম।।